আমি মরে যেতে পারি—হয়তো ভোরের প্রথম আলোয়,
যখন শিশিরবিন্দু ঘাসে মুক্তোর মতো ভাসে,
আর পাখিরা গায় জীবনের গান—
মিশে যায় সে সুরে;
অথবা নিঝুম রাতে, যখন জোনাকিরা জ্বলে,
আলো-আঁধারের খেলা চলে—
তখনও পারি যেতে,
এক ফোঁটা চোখের জল হয়ে,
শুকিয়ে যাওয়া ঘাসে।
আমি মরে যেতে পারি—যখন ভাঙবে মিথ্যে স্বপ্ন,
বুকভরা আশা নিয়ে গড়া কাঁচের প্রাসাদ,
হঠাৎ ঝড়ে ভেঙে যাবে—ধুলোয় মিশে যাবে সব;
তখন আমার ভেতরকার আমি,
নিঃশব্দে মরবে,
প্রতিটি ভাঙা কাঁচের টুকরোয় মিশে যাবে আর্তনাদ,
সে এক নীরব মৃত্যু—যা কেউ দেখবে না, জানবে না।
আমি মরে যেতে পারি—তোমার হাত ছেড়ে গেলে,
এই জনবহুল শহরে, তোমার অচেনা পথে;
যখন হাজারো মানুষের ভিড়েও খুঁজব তোমার ছায়া,
আর পাবো না কোথাও—তখন আমার অস্তিত্বও হারাবে,
এক অজানা শূন্যতা গ্রাস করবে সব—সেও এক মৃত্যু,
যেখানে শরীর বাঁচে, কিন্তু আত্মা বেঁচে থাকে না।
আমি মরে যেতে পারি—কালের করাল গ্রাসে,
প্রতিটি দিন, প্রতি পলকে যখন বয়স বাড়ে;
তখন যৌবন ফুরিয়ে যায়, স্মৃতিরা হয় ধীর,
পুরোনো ছবিগুলো কথা বলে—কিন্তু আমি শুনি না,
সেই আমিটাই মরে যায়—ফুরিয়ে যায় জীবনের রঙ,
শুধু পড়ে থাকে কিছু সময়ের সাক্ষী—ফ্যাকাসে পাতা।
আমি মরে যেতে পারি—যখন সমাজ আমাকে গিলে খাবে,
অন্যায়ের প্রতিবাদে গলা চড়াতে গিয়ে,
যখন মুখোশ পরা মুখগুলো চিনিয়ে দেবে শত্রু;
তখন বিবেকটা মরে যাবে, সাহস হারিয়ে ফেলবে বুক,
প্রতিটি ভীরু পদক্ষেপ—এক একটি কবরের সমান,
যেখানে আত্মা মুক্তি পায় না, শুধু বন্দি থাকে ভয়ে।
আমি মরে যেতে পারি—যদি কিছুই না করতে পারি,
এই বিশাল পৃথিবীতে—শুধু ভেসে যাই স্রোতের টানে;
যদি না পাই কোনো ভাষা, যদি না ফোটে কোনো ফুল,
যদি না লিখি কোনো কথা—যেটা মনে রাখবে কেউ;
সেই অপূর্ণতা নিয়ে—এক অস্তিত্বহীনতা ঘিরে ধরবে,
সে এক দীর্ঘস্থায়ী মৃত্যু—যা কখনো শেষ হয় না।
আমি মরে যেতে পারি—অগণিত উপায়ে,
কিন্তু মৃত্যু নয়, জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ,
প্রতিটি মৃত্যু—নতুন জীবনের সূচনা, নতুন পথের ইশারা;
তাই ভয় নেই মরে যেতে, শুধু বেঁচে থাকাটা হোক অর্থপূর্ণ,
প্রতিটি মুহূর্ত হোক জীবনের গান—যা ছড়িয়ে দেবে আলো,
আর আমিও মিশে যাবো সেই অসীমতায়—চিরকালের তরে।
মুক্তি চাই
মুক্তি মানে কেবল মানচিত্রে আঁকা সীমানা নয়,
নয় কোনো মাপকাঠিতে মেপে নেওয়া এক টুকরো ভূমি।
আমার মুক্তি চাই সেই প্রতিটি নিঃশ্বাসে—
যেখানে মাঝরাতে কোনো অদৃশ্য ভয় টুঁটি চেপে ধরবে না।
আমি সেই মুক্তির কথা বলছি,
যেখানে মিছিলে স্লোগান দিতে কোনো আঙুল কাঁপবে না;
যেখানে কলমের কালিতে সত্য লিখলে—
যমদূত এসে দরজায় কড়া নাড়বে না।
আমার মুক্তি চাই এমন এক ভোরে,
যেখানে রোদ উঠবে সাম্যের রঙ মেখে;
যেখানে ক্ষুধার্ত শিশু ডাস্টবিনে রুটি খুঁজবে না—
বরং তার হাতে থাকবে আগামীর বর্ণমালা।
দশকের পর দশক মিথ্যে আশার শৃঙ্খলে বন্দী—
সেই অন্ধকার মানুষের জন্য আমি মুক্তি চাই।
অসহায় মায়ের অশ্রুর বিচার পেতে মুক্তি চাই,
যাঁর সন্তান ফেরেনি কোনো এক কালবৈশাখীর ঝড়ে।
বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে মুক্তি চাই,
যাতে অট্টালিকা আর জীর্ণ কুঁড়েঘর—
একই আকাশের নিচে নির্ভয়ে ঘুমাতে পারে।
আমি চাই সেই মুক্তি—
যা কেবল উৎসবের দিনে পতাকায় শোভা পায় না;
বরং যা বেঁচে থাকে শ্রমিকের ঘামে, প্রতিদিনের অন্নে,
আর প্রতিটি মানুষের আত্মসম্মানে।
নিজের ইচ্ছের কথাগুলো বাতাসের কানে পৌঁছে দিতে,
দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে নিজের বিবেককে উত্তর দিতে—
আমার এক সমুদ্র সমান মুক্তি চাই।
আমি মুক্তি চাই সেই কিশোরীর তরে,
যে নির্ভয়ে একাকী ফিরবে আপন ঘরে;
ল্যাম্পপোস্টের আলোয় যার ছায়া হবে না আর লাঞ্ছিত।
আমি মুক্তি চাই সেই কৃষকের তরে,
যার ঘাম ঝরানো ফসলে উদর পূর্তি হয় সবার;
অথচ তার ঘরে আজও ছেঁড়া কাঁথা আর উপোসের হাহাকার।
আমি সেই মুক্তি চাই—
যেখানে বিচারালয়ের পাল্লা অর্থের ভারে নুয়ে পড়বে না,
যেখানে সত্য দাঁড়াবে বুক চিতিয়ে, আর মিথ্যে পালাবে লেজ গুটিয়ে।
ধর্মের নামে কাটাকাটি নয়, বর্ণের বিষে ঘৃণা নয়—
আমি মুক্তি চাই এক উদার মানবিকতার তরে;
যেখানে মন্দির, মসজিদ আর গির্জা হবে প্রশান্তির নীড়, বিদ্বেষের গুদাম নয়।
যেখানে মানুষ হবে মানুষের পরমাত্মীয়,
আর মানুষের পরিচয় হবে কেবলই— 'মানুষ'।
আমি মুক্তি চাই ইন্টারনেটের প্রতিটি স্পন্দনে,
ডিজিটাল দেয়াল তুলে কেউ যেন আমার ভাবনাকে বন্দি করতে না পারে।
আমি মুক্তি চাই ইতিহাসের পাতায়,
যাতে সত্য বিকৃত করে কেউ তার মসনদ সাজাতে না পারে।
আমি চাই সেই মুক্তি, যা আমার ভাষাকে দেয় বিশ্বজোড়া সম্মান,
আমার বর্ণমালাকে দেয় রাজপথ থেকে অন্তরীক্ষ পর্যন্ত অবাধ বিচরণ।
আমার মুক্তি চাই শিক্ষার প্রতিটি প্রাঙ্গণে,
যেখানে বইয়ের বোঝা নয়, বরং চিন্তার ডানা মেলতে শেখানো হবে।
যেখানে জিপিএ-৫ এর নেশায় কোনো কিশোর তার শৈশব বিসর্জন দেবে না,
বরং প্রতিটি সৃজনশীল মাথা পাবে এক এক বিশাল আকাশ।
আমার মুক্তি চাই যুক্তির তলোয়ার শানিত করতে,
যাতে অন্ধবিশ্বাসের পাহাড় গুঁড়িয়ে দিয়ে বিজ্ঞানের আলোয় পথ চলতে পারি।
আমি চাই সেই মুক্তি, যেখানে শিল্পীর তুলি হবে শাণিত অস্ত্র,
গায়ক গাইতে পারবে শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উঁচু সুরটি।
যেখানে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলতে কোনো অভিনেতাকে ভাবতে হবে না পরিণতির কথা।
আমার মুক্তি চাই আমার ঐতিহ্যের জন্য,
যাতে কেউ এসে হুকুম জারি করতে না পারে— আমি কী খাব, আমি কী পরব।
আমার মুক্তি চাই পরিবেশের জন্য,
যাতে পাহাড়গুলো কাটা না হয়, যাতে নদীগুলো বিষাক্ত না হয় স্বার্থের লোভে।
আগামীর শিশুদের জন্য এক টুকরো সবুজ আর বিশুদ্ধ বাতাস রেখে যেতে—
আমার এক পরম প্রকৃতির মুক্তি চাই।
শোনো হে পৃথিবী, আমার কেবল একদিনের মুক্তি নয়—
আমার চিরস্থায়ী এক অস্তিত্বের মুক্তি চাই।
পূর্ব দিগন্তের লাল সূর্যটা যেন কেবল একবিন্দু রঙ না হয়,
সে যেন হয় শোষণের অবসান আর নতুন স্বপ্নের উদ্বোধন।
যতদিন একজন মানুষও বন্দি থাকে অন্যায়ের কারাগারে,
ততদিন আমার আর্তনাদ থামবে না—
আমার বুক চিরে বারবার ধ্বনিত হবে:
মুক্তি চাই, আমার পূর্ণাঙ্গ মুক্তি চাই!
বিশ শতক পেরিয়ে একুশ শতকের এই সন্ধিক্ষণে—
যখন পৃথিবী পাল্টে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর যন্ত্রের জোয়ারে,
তখনও আমার মৌলিক মানুষ হওয়ার মুক্তি চাই।
যাতে রোবটের ভিড়ে আমি হারিয়ে না ফেলি আমার সংবেদনশীল মন,
যাতে যন্ত্রের গতির কাছে আমার আত্মার প্রশান্তি হেরে না যায়।
আমার মুক্তি চাই নিজের ভুল করার অধিকার বজায় রাখতে,
কারণ নিখুঁত যন্ত্র হওয়ার চেয়ে আমি একজন অসম্পূর্ণ মানুষ হতেই ভালোবাসি।
এই দীর্ঘ পথচলায় আমি কোনো বিরাম চাই না,
যতক্ষণ না প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য সম্মান ফিরে পায়,
যতক্ষণ না শেষ অবহেলিত মানুষটির মুখে ফুটবে বিজয়ের হাসি—
ততক্ষণ আমার কেবল একটাই দাবি—
আমার আমৃত্যু মানুষের মতো বাঁচার মুক্তি চাই।




0 মন্তব্যসমূহ
অমার্জিত মন্তব্য করে কোনো মন্তব্যকারী আইনী জটিলতায় পড়লে তার দায় সম্পাদকের না৷