New

শ্বেতপত্র

বাবার কোলে মেয়ের মৃত্যু এবং কুকুরছানা হত্যার গল্পঃ আহম্মেদুল কবির


শীত-সকালে কাঁথার প্যাচ খুলে কাজে বের হতে মন চায় না। আর কলুর বলদের মতো সংসার জীবনে কতোই না পরিশ্রম করলাম, লাভ কী? যে লাউ সেই  কদু। বাপে ছিলো গ্রামের চৌকিদার আর আমি হইলাম মন্তাজ গৃহস্তের বাড়ির দরোয়ান। যা মাইনে পাই সংসার চলে না রে ওহাব।

আজ পকেটে একটি টাকাও নেই। একটা বিস্কুট একটা লাল চা দে। যে কয়টা টাকা পাওনা আছে মাইনে তুলে কাল দিয়ে দিব। একটা ডাবরি চুরুটও দিস—বলে ওহাবের টিস্টলে বসে পড়লো রফিক। রফিককে একা দেখে ওহাব জিজ্ঞেস করে কি গো রফিক ভাই সরকারকে দু'দিন থেকে দেখছি দোকানে আসছে না। কোথাও গেছে নাকি। সরকারের কথা তুলতেই জীভে কামড় দেয় রফিক। মাথায় হাত দিয়ে বলে—যাহ! সরকার সকালে ওর বাড়িতে যেতে বলেছিলো এতটুকুও মনে ছিলোনা। দে তাড়াতাড়ি চা দে এখুনি সরকারের বাড়িতে যেতে হবে। 

এমন তাড়াহুড়ো দেখে ওহাব আবারও জিজ্ঞেস করে—কিছু হয়েছি কী রফিক ভাই। 

না সরকারের কিছু হয় নাই, ওর ছোট্ট মেয়েটা মারা গেছিলো না। আজ ওর মৃত্যুবার্ষিকী। সকালে বাড়িতে মিলাদ আছে। আমি না গেলে সরকার খুব কষ্ট পাবে। 

ফিরোজ সরকার—সবাই ওকে সরকার বলেই ডাকে।

আজ ফিরোজ সরকারের ছোট্ট মেয়ে ফাতেমার মৃত্যুর দিনটির কথা মনে পড়ে গেল রফিকের। রফিক ফিরোজের বাল্যবন্ধু। সুখে- দুঃখে দু'জন একসাথেই বড় হয়েছে। 

দু'জনেই সংসারী মানুষ। আয় রোজগার তেমন না থাকলেও তাদের দুজনকেই সংসার চালাতে হয়। এক কথায় বলা যায় তারা উভয়েই অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। তবে রফিক বলে অভাবী সংসার নাকি কোন সংসারই নয়। তার মতে অভাব হলো পূর্বপুরুষের পাপের ফল আর ধর্মজ্ঞান থেকে অধর্মে প্রবেশের সরলপথ। ওহাবের টিস্টলে বসে রফিক তার জীবনের কঠিন বাস্তবতা মনে করে নিজেকে গালি দিতে লাগলো। স্টলে বসা রফিকের সমবয়সী গৌরব, সাম্য, ফারাজি, মোকলেছ বাবু মিয়া রফিককে একটু অন্যমনস্ক দেখে জানতে চায়, কী হয়েছে রফিক। একা একা কীসব ভাবছিস। কিছু হয়েছে নাকি। 

রফিক জানায়, না রে ভাই তেমন কিছু না। আজ আমার বন্ধু ফিরোজের বড় মেয়েটার মৃত্যুর কথা মনে হওয়ায় হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।  

এমন সময় পাড়ার একটি মা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে কান্না করছে, আর এদিক ওদিক ছুটছে। গত দুদিন আগেও মা কুকুরটির সাথে চার পাঁচটি বাচ্চা দেখেছিলো সবাই। আজ বাচ্চা গুলো সাথে নেই। মা কুকুরটির বাচ্চাগুলো নেই কেন বিষয়টি উপস্থিত সকলের জিজ্ঞাসার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। মা কুকুরটি অন্যদিন মানুষ দেখলেই পালিয়ে যেত। অথচ আজ সে নিজেই মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে এমনকি কারও কারও পায়ের কাছে এসে কান্না করছে, দু' চোখ ভিজে যাওয়ার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মা কুকুরটির আচরণ সকলকে হতবাক করছে। এমন সময় একটি ভ্যানে পাড়ার এক মহিলাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ওহাব মিয়া উপস্থিত সকলকে জানায়, ভাই ওই মহিলা এই মা কুকুরের বাচ্চাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। গত কয়েকদিন থেকে বিষয়টি নিয়ে দেশ তোলপাড়। মানুষ এতো খারাপ হয়, কী দরকার ছিলো বাচ্চা গুলোকে হত্যা করার। অবুঝ প্রাণি ওরা তো কারও ক্ষতি করেনি। যেমন পাপ করেছে চৌদ্দ শিকের ভাত খাইলে মনে পড়বে যেমন কর্ম তেমন ফল। ওহাবের কথা শুনে রফিকের মন আঁৎকে উঠলো।  ভাবতে লাগলো আর ইস! শব্দে বলেই ফেললো, সেদিন যদি গ্রামের সকলে এগিয়ে আসতো তাহলে বন্ধু ফিরোজের মেয়েকে আর বিনা চিকিৎসায় বাবার কোলে ছটফট করে মরতে হতো না। সামান্য কয়েকটা টাকার জন্যে অসুস্থ ছোট্ট মেয়েটা চোখের সামনে মরতে দেখে সেদিন থেকে মানুষের প্রতি ভালোবাসা মরে গেছে রফিকের। রফিক বিরবির করে বলতে থাকে যেখানে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে না, মানুষ হয়ে মানুষের বিপদে এগিয়ে আসেনা সেখানে কুকুর ছানা হত্যা সেটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার।

ফিরোজের মেয়েটা যখন মারা যাচ্ছিলো, ওর ছোট্ট হাতের আঙ্গুলগুলি দেখেছি বাবার অশ্রু মুছে দিতে। নির্বাক ফিরোজ যখন জানতেই পেরেছে মেয়ে তার চলেই যাচ্ছে ওপারে। ডুকরে কান্নার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু পারে নাই। মেয়ের চিকিৎসার গত কয়েকদিনে ফিরোজ বুঝেই গেছিলো এখন মানুষ - মানুষের দুঃখে দুঃখি হয় না। অবাক ব্যাপার কুকুর ছানা হত্যায় দেশ নাকি তোলপাড় শুনে রফিক হাসে। এদিকে হাসির অন্তরালে ছোট্র ফাতেমার মৃত্যুর মুহূর্ত মনে করে চোখ ভিজে যায় রফিকের।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

15 মন্তব্যসমূহ

  1. বিখ্যাত কবি শামসুল এস চৌধুরীমঙ্গলবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

    তোমাকে আমি আজ উপাধি দিলাম গল্পরাজ ৷ তুমি আমার যোগ্য নাতি মোখলেসুর রহমান চৌধুরির মতোই এক টেমেন্ডাস প্রতিভা গল্পরাজ আহাম্মেদুল কবীর

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. বিখ্যাত কবি শামসুল এস চৌধুরী
      আপনার মতো জগৎখ্যাত ব্যাক্তিত্বের বদৌলতে সবাই একদিন খ্যাতনামা না হয়ে পারবেই না

      মুছুন
  2. দোয়া করি ভাগনা তুমি আর বড় হও
    অনেক অনেক বড় হও
    বড় কবিসাহিত্তিক হও

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. জবাব আপনার দোয়া বর্ষিত হতেই থাক দুনিয়ার সকল মামাদের ওপর।

      মুছুন

  3. সম্পাদক সাব, গল্পটা ঠিক জুতের লাগাইল না। মানসম্পন্ন হয়নাই।

    উত্তরমুছুন

  4. এটি গল্প? 😂😂
    গল্পের চুতরী ফাইট 😂😂

    ছোটোগল্্পের জনক রবীন্দ্রনাথ এসব দেকলে আত্তহত্তা করতেন

    যেমন বালকামা সম্পাদক তেমন বালকামা লেকক

    উত্তরমুছুন
  5. আহা! কী অদ্ভূত মর্মান্তুক গল্প! আমি কেন্দে ফেললাম ভাই। আপনার হাত স্বর্নাক্ষরে বাধাই করে রাখবো।

    উত্তরমুছুন
  6. গল্পটা খুব আবেগের হইছে কবির, বুকে এসে যেন টান ধরে নেয়। পিতার কষ্ট সন্তান তো আর বোঝে না, তুমি কবি বইলা বুঝলা। তুমারে ধন্যবাদ কবি।

    উত্তরমুছুন
  7. মহান বিজয় দিবসে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর সাংআাদিক, অমর কবি, মহান লেখক জনাব কবিরুদ্দিন কবির কুড়িগ্রাম এর সাথে রেখে দিলাম ভবিষ্যতের জন্য আজন্ম লালিত স্মৃতি --

    উত্তরমুছুন
  8. ঠিকোই কইছেন, ব্রেন্ট নাই টেনশনও নাই।।।

    উত্তরমুছুন
  9. মোখলেস ভাই উপাখ্যান সিরিজের রচয়িতা হিসেবে বিশ্বজিৎ দাস-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। দেশের জনপ্রিয় রম্য ম্যাগাজিনগুলোতে নিয়মিতই তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি তিনি সায়েন্স ফিকশন, ছোটগল্প,ভূতের গল্পও লিখে থাকেন। পেশায় তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। দিনাজপুর সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য গ্রš’গুলি হলো- মোখলেস ভাই উপাখ্যান, মোখলেস ভাই উপাখ্যান-২, মোখলেস ভাই উপাখ্যান-৩, ধরাশায়ী মোখলেস ভাই, পালাও মোখলেস , এবং মোখলেস , আনলাকি মোখলেস ভাই, ফিরে এলো মোখলেস ভাই, গপ্পোবাজ মোখলেস ভাই , ভাইরাল মোখলেস ভাই (রম্য সিরিজ)

    উত্তরমুছুন
  10. একটা কবিতা লিকলাম। সাহস থাকলে প্রকাশ করো।
    "লাইফকে সুন্দর করো, মনকে ফ্রেশ করো
    হৃদয়কে নরম করো, টাইমকে ইউস করো
    লাভ কে মিস করো, বন্ধুকে এসএমএস করো
    হ‍্যাপি নিউ ইয়ারকে ওয়েলকাম করো
    Welcome Happy New Year 2027" 🇨🇭

    উত্তরমুছুন

অমার্জিত মন্তব্য করে কোনো মন্তব্যকারী আইনী জটিলতায় পড়লে তার দায় সম্পাদকের না৷