‘এশিরিয়া ধুলো আজ—বেবিলন ছাই হয়ে আছে।’ জীবনানন্দ দাশের কবিতার এই পঙক্তি মানবসভ্যতার অনিবার্য পরিণতি ধ্বংসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। হাজার বছর ধরে কত সভ্যতা, কত নগরী গড়ে উঠেছে, আবার কালের ধুলোয় বিলীনও হয়ে গেছে। তেমনি এক প্রাচীন দুর্গনগরী নওগাঁ জেলার মাহিসন্তোষে আজ আমাদের যাত্রা, যা এখন এক ধ্বংসস্তূপ। এর প্রত্নগভীরতায় লুকিয়ে রয়েছে হাজার বছরের জানা-অজানা ইতিহাস। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, মিশরীয়, সুমেরীয় ও চৈনিক সভ্যতার মতো অধিকাংশ সভ্যতার বিকাশ ছিল নদীকেন্দ্রিক। মাহিসন্তোষের এই প্রাচীন জনপদও গড়ে উঠেছিল আত্রাই নদের পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চলে।
নওগাঁ সদর থেকে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার সড়কপথ পেরোলেই ধামইরহাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এই ঐতিহাসিক প্রত্নস্থল। এ পথে আসতে আসতে চোখে পড়ে দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানখেত আর অসংখ্য তালগাছের সারি। তালগাছগুলো যেন শুধু গাছ নয়, বরেন্দ্রের বাতিঘর হয়ে পথ দেখায়, স্বাগত জানায় বরেন্দ্রভূমিতে। মাহিসন্তোষে এলে এর কাছাকাছি দূরত্বে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করা যায়। এখান থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে রাজা রামপাল প্রতিষ্ঠিত জগদ্দল মহাবিহার, ১২ কিলোমিটার দূরে পাল যুগের মন্ত্রীদের বাসস্থান মঙ্গলবাড়ি, ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে রাজা ধর্মপাল প্রতিষ্ঠিত সোমপুর মহাবিহার এবং প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কৈবর্ত বিদ্রোহের জয়স্তম্ভ দিবর দিঘি। পালদের আবাসভূমির নিকটবর্তী হওয়ায় মনে করা হয়, এ নগরীর পত্তন সম্ভবত তাঁদের হাতেই। এখানকার প্রাচীন জলাশয়গুলো উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। পণ্ডিতদের মতে, এই বৈশিষ্ট্যের জলাশয় হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের।
বাংলায় মুসলিম রাজত্বের সূচনা হয় ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির নদীয়া জয়ের মাধ্যমে। বখতিয়ার খিলজি লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) দখল করে সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে দেবকোটে রাজধানী স্থাপন করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই রাজধানী হিসেবে লক্ষ্মণাবতী ও দেবকোট মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিকাশ লাভ করে। তবে রাজধানী না হয়েও মাহিসন্তোষ একইভাবে বিকশিত হতে থাকে সেই সময়ে। প্রশাসনিক নগর ও টাঁকশাল হিসেবে এ স্থান প্রসিদ্ধ হলেও মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্র হিসেবে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বখতিয়ার খিলজি তাঁর অধিকৃত উত্তর-পশ্চিম বাংলার রাজ্যকে ইকতা নামের চারটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত করে খিলজি মালিকদের মধ্যে চারজনকে মুকতা পদে নিয়োগ দেন। মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যে বখতিয়ার খিলজি ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর আলী মর্দান খিলজির হাতে নিহত হওয়ার পর খিলজি মালিকদের মধ্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শিরান খিলজি দেবকোট সিংহাসনে বসেন। তিনি চারটি ইকতার মধ্যে একটি এই মাহিসন্তোষ দুর্গনগরীর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়। এরপর অযোধ্যার শাসনকর্তা কায়েমাজ রুমির কাছে পরাজিত হয়ে তিনি পালিয়ে এসে মাহিসন্তোষে আশ্রয় নেন। এখানে স্বপক্ষের বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। তাঁকে এখানেই সমাহিত করা হয়। মাহিসন্তোষে তিনিসহ তাঁর তিন সহযোদ্ধার কবর রয়েছে, যা ১৪ হাত কবর নামে পরিচিত। লম্বা এই কবর দেখতে দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। আজ এই ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়ালে এর অতীত গৌরব গল্পের মতোই দানা বেঁধে ওঠে।
মাহিসন্তোষের নামকরণ নিয়ে কয়েকটি মত রয়েছে। এ স্থানটি পাল রাজা মহীপালের নামানুসারে মাহীগঞ্জ বা মাহীনগর নামে বেশি পরিচিত। তবে ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত মিনহাজ-ই-সিরাজের ‘তবাকাত-ই-নাসিরি’ গ্রন্থে মসিদা-সন্তোষ নামে স্থানের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ‘তবাকাত-ই-আকবরি’ গ্রন্থেও সন্তোষ-এর উল্লেখ রয়েছে। সেন আমলেও স্থানটি সন্তোষ নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায়। স্থানটির নাম সন্তোষ থেকে মাহিসন্তোষ হয় মুসলিম আমলে। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, একজন সুফি সাধক মাছের পিঠে চড়ে সন্তোষে আসেন। মাছের ফারসি প্রতিশব্দ ‘মাহি’। সন্তোষের সঙ্গে ‘মাহি’ যুক্ত হয়ে নাম হয় ‘মাহিসন্তোষ’। কেউ কেউ বলেন, সংস্কৃত ‘মহি’ ও ফারসি ‘গঞ্জ’ শব্দের সংযোগে মুসলিম আমলে এর নামকরণ হয়েছিল। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, সন্তোষের সঙ্গে মা শব্দের অপভ্রংশ মাই বা মায়ি (যা এক মহিলা পীর ও তাঁর মেয়ের সমাধির সঙ্গে সম্পৃক্ত) যুক্ত হয়ে স্থানটির নাম হয় মাইসন্তোষ বা মায়িসন্তোষ। সুলতান রুকন উদ্দিন বারবক শাহর (১৪৫৯-৭৬) আমলে তাঁর নামানুসারে এর নাম হয় বারবকাবাদ। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর আমলের মুদ্রা থেকে। ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বারবকাবাদ টাঁকশাল থেকে এ মুদ্রা প্রচলিত হয়েছিল। আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে দেখা যায়, মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলার ১৯টি সরকারের মধ্যে বারবকাবাদ ছিল একটি। এর অধীন ৩৮টি মহাল বা পরগনা ছিল। রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনার বিভিন্ন অংশ এই সরকারের অধীন ছিল। প্রশাসনিক নগর ও টাঁকশাল হিসেবে এটি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।
প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ থেকে শুরু করে মোঘল আমল পর্যন্ত মাহিসন্তোষ একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে পাওয়া বিভিন্ন প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ, একটি দুর্গ, অনেক প্রাচীন জলাশয়, অসংখ্য অখণ্ড ও ভাঙা প্রাচীন ইট, মৃৎপাত্রের ভাঙা অংশ, শিলালিপি ও অন্যান্য প্রত্নবস্তু এর প্রাচীনত্বের নিদর্শন। একমাত্র প্রাচীরবেষ্টিত একটি দুর্গ ও অসংখ্য পাথরখণ্ড ছাড়া হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ এখানে পাওয়া যায়নি। মাহিসন্তোষের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এই স্থানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুর্গটি হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে নির্মিত হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। পরবর্তী সময়ে মুসলমানরা সংস্কার করে এটিকে আরও বেশি সুরক্ষিত করে গড়ে তোলেন। ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর 'বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ' বইয়ে লিখেছেন, ‘উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ মাটির প্রাচীর ও প্রাচীরের বাইরে সুপ্রশস্ত পরিখাবেষ্টিত এ দুর্গের আয়তন ২৫৫ মিটার × ২২৫ মিটার।’ দুর্গের ভেতরের অংশের জমি এবড়োখেবড়ো। দুর্গটিকে সুরক্ষিত করার জন্য আত্রাই নদকে এর উত্তর ও পশ্চিম দিকের পরিখা হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে পরিখা খনন করা হয়।
২.
মাহিসন্তোষ মুসলিম বাংলার অন্যতম প্রধান শিক্ষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্র ছিল। মুসলিম শাসকেরা রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্প্রসারণে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার শুরুর দিকে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল মসজিদ, খানকা ও আস্তানা। এরপর মসজিদকেন্দ্রিক মক্তব ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। নামাজের পাশাপাশি মসজিদগুলোয় মক্তব স্থাপন করে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় মাদ্রাসা। এর পাশাপাশি খানকার মাধ্যমে সুফিরা ধর্মপ্রচার শুরু করেন। সুলতানি শাসনামলে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাহিসন্তোষের মাদ্রাসাটি ছিল শীর্ষস্থানে। মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা সুফি সাধক ও পীর হজরত তকীউদ্দীন আল-আরাবি। তাঁর সুখ্যাতিতে দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জন ও সুফি তত্ত্ব জ্ঞানচর্চার লক্ষ্যে এই মাদ্রাসায় সমবেত হতেন। দুর্গের কয়েকশ গজ উত্তর-পশ্চিমে প্রাচীরে ঘেরা একটি আমবাগানের কোণে রয়েছে তাঁর মাজার। এখানে এলে মন শান্ত হয়ে আসে। নির্জনতার ভেতর পাশেই এক আমগাছের শাখায় একমনে ডেকে চলে একটি ঘুঘু। প্রার্থনার মতো নিবিড় হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক যোগ।
মাহিসন্তোষে তিনটি শিলালিপি পাওয়া যায়। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ভি ওয়েস্টম্যাকট দুটি শিলালিপি উদ্ধার করেন। এখানে একটি বড় মসজিদের ধ্বংসাবশেষ খননকালে রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা কুমার শরৎ রায় তৃতীয় শিলালিপিটি উদ্ধার করেন। এই মসজিদের নাম বারদুয়ারি বা রাজবাড়ি মসজিদ। এই মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। এখানে খনন কাজ চলে। পরে জঙ্গল পরিষ্কার করে মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজ পড়ার জন্য টিনের ছাপড়া মসজিদ তৈরি করা হয়। প্রাচীন মসজিদের দেয়াল আর অবশিষ্ট নেই। শুধু পাথরগুলো স্তূপাকারে ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে মসজিদ প্রাঙ্গণে। আর কালো পাথরের অলংকারশোভিত কিছু স্তম্ভ। মসজিদটির পশ্চিম দেয়ালে পাথরনির্মিত পাঁচটি মিহরাব ছিল। একটি মিহরাব বরেন্দ্র জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। মিহরাবটি এখনো জাদুঘরে সংরক্ষিত। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এর পেছনে খোদাই করা বিষ্ণু ও সূর্যদেবতার মূর্তি। এর কারণ অনুসন্ধানে উত্তর পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে পাথর সহজলভ্য না হওয়ায় প্রাচীন কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাথরের চাঁই সংগ্রহ করে এনে এসব মিহরাব বানানো হতো। মূর্তিগুলোর সামনের অংশ প্রশস্ত দেয়ালের ভেতরের দিকে থাকায় মসজিদের ভেতর বা বাইরে থেকে এগুলো দেখা যেত না।
বাংলায় মুসলিম রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং রাজধানী স্থানান্তরের কারণে মাহিসন্তোষ দুর্গের গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ে মহামারিতে অনেক মানুষ মারা যাওয়ায় সুবাদার মুমিন খাঁন গৌড় থেকে তান্ডায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে এখান থেকে রাজমহলে এবং আরও পরে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। ১৬ শতকের শেষের দিকে অনেকাংশে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে এই দুর্গনগরীটি। এটি মোটামুটিভাবে মোঘল যুগ পর্যন্ত টিকে ছিল। পরবর্তীকালে সম্ভবত মোঘল যুগের শেষ ভাগে মহামারি বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরিত্যক্ত হয় মাহিসন্তোষ।
একসময়ের সেই বিখ্যাত নগরী আজ কেবল এক ধ্বংসস্তূপই নয়, অনেক যুদ্ধ, জয়-পরাজয় ও অজানা অজস্র ঘটনার নীরব সাক্ষী। ভ্রমণপিপাসুদের হাতছানি দিয়ে ডাকে হাজার বছরের স্মৃতিবিজড়িত রহস্যাবৃত এই প্রত্নস্থল। এখানে এলে জাতিস্মরের মতো বিগত সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কিংবদন্তি আর কালের পাতায় মুদ্রিত ইতিহাস।





1 মন্তব্যসমূহ
تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّ وَ مِنْكُمْ
উত্তরমুছুন(তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম)
অর্থ: আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন।
ঈদ মোবারক🌙
অমার্জিত মন্তব্য করে কোনো মন্তব্যকারী আইনী জটিলতায় পড়লে তার দায় সম্পাদকের না৷