বাঙলাদেশে জন্মেছেন মানে আপনার মৃত্যু হবে দুর্ঘটনায়। এখানে স্বাভাবিক মৃত্যুই বরং একটু সন্দেহজনক ব্যাপার। বাস চাপা। লঞ্চডুবি। ভবন ধস। আগুন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। ফেরি। কিংবা রেললাইন।
হাসপাতালের অক্সিজেন নাই। ডাক্তার নাই। ডাক্তার আছে তো ওষুধ নাই। ওষুধ আছে তো আইসিইউ নাই। আইসিইউ আছে তো সেখানে আগে থেকেই এক এমপির ভাগ্নে শুয়ে আছে। আপনি অপেক্ষা করেন। অপেক্ষা করতে করতে মরে যান। তারপর আপনাকে নিয়ে নিউজ হবে— “অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ পরিবারের।” অভিযোগ! কেন ভাই, রাষ্ট্র কি কাস্টমার কেয়ার?
এদেশে জন্ম নেয়ার অপরাধে একদিন আমাদের সবাইকে কান ধরে উঠবোস করানো হবে। বলবে থাম হারামজাদা। ভেবেছিস কী, তুই নাগরিক! না, তুই আসলে সারভাইভার। এই দেশে জন্মানো মানে জন্মের পর থেকেই একটা অদৃশ্য স্কোয়াডের সঙ্গে রাশিয়ান রুলেট খেলা। আজ না কাল। কাল না পরশু। কেউ ছাদ থেকে পড়ে মরবে। কেউ সড়কে। কেউ থানায়। কেউ নদীতে। কেউ হাসপাতালে ঢুকে। কেউ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে। ডেস্টিনেশন ফাইনাল।
বাঙলাদেশে রাস্তা পার হওয়া দস্তয়েভস্কির উপন্যাস পড়ার মতোই জটিল। সবসময় টেনশন। পরের লাইনে কী হবে জানা নেই। একটা বাস আসছে। তার ব্রেক কাজ করে কি না কেউ জানে না। ড্রাইভার জাগ্রত না ঘুমন্ত তাও কেউ জানে না। লাইসেন্স আছে কি না জানা নেই। বাসটার ফিটনেস নেই এটা নিশ্চিত। তবু সবাই উঠছে। কারণ অফিস আছে। জীবনানন্দও তো ট্রামের নিচে পড়েছিলেন। তবে কলকাতার ট্রাম অন্তত সভ্য ছিল। আমাদের এখানে বাসগুলো মানুষ না খেয়ে ফেলা পর্যন্ত শান্ত হয় না। বিশেষত ঢাকার বাস। এরা যেন মাংসাশী ডাইনোসর। শুধু দাঁত দেখা যায় না।
এই যে কদিন থেকে হামে বাচ্চাগুলো মারা যাচ্ছে। কী ভয়ংকর শব্দ— হাম। শুনতে কেমন পুরোনো আমলের অসুখ লাগে। মনে হয় শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আছে। অথচ এখনো বাচ্চাগুলো মরছে এতে। টিকা পায়নি। হাসপাতাল পায়নি। সময়মতো চিকিৎসা পায়নি। একটা রাষ্ট্রের পক্ষে এর চেয়ে লজ্জার কী থাকতে পারে? উনিশ শতকের রোগ একবিংশ শতাব্দীতে ফিরে এসে শিশুদের মেরে ফেলছে। তারপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আছে। পর্যবেক্ষণ! কীসের পর্যবেক্ষণ? চিড়িয়াখানার জিরাফ দেখতে গেছেন নাকি?
অনেকে আবার দেশপ্রেমে গলে গিয়ে বলবে বিদেশেও অ্যাক্সিডেন্ট হয়। অবশ্যই হয়। পৃথিবীর সব দেশেই মানুষ মরে। কিন্তু সব দেশে মানুষ এমন অবহেলায় মরে না। এখানে মৃত্যু একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হ্যাবিট। কালকে একটা সেতু ভাঙল। আজকে সবাই হা হুতাশ করল। পরশু ভুলে গেল। তারপর নতুন সেতু। নতুন টেন্ডার। নতুন কমিশন। নতুন মৃত্যু। এই যে চক্র। এটা এত পুরোনো যে এখন আর কেউ অবাকও হয় না। মানুষ ধর্ষণের ছবির নিচে হা হা রিয়্যাক্ট দেয়। তারপর বিরিয়ানি খেতে যায়।
আমরা অ্যাডজাস্ট করে ফেলেছি। এই অ্যাডজাস্টমেন্টটাই সবচে বড় ট্র্যাজেডি। বাসে উঠলে মনে হয়, যুদ্ধে যাচ্ছি। কী সাবধান হব? ফুটপাত দখল। রাস্তা খোঁড়া। ওপরে ঝুলছে বিদ্যুতের তার। নিচে ম্যানহোল খোলা। ডানে ছিনতাইকারী। বাঁয়ে মাদকাসক্ত। মাঝখানে আপনি। মানবসভ্যতার গিনিপিগ।
ভাবুন তো, এদেশে সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রি কী। গার্মেন্টস? রেমিট্যান্স? না। মৃত্যু। প্রতিদিন এত মানুষ মরছে যে মৃত্যুও এখানে লোকাল ট্রেনের মতো। ঠাসাঠাসি। কোনো স্পেস নেই। একটা বাচ্চা নর্দমায় পড়ে গেল। নিউজ। পাঁচ মিনিট পরে আরেকটা নিউজ। আগুনে পুড়ল। তারপর আরেকটা। লঞ্চডুবি। তারপর আরেকটা। হাম। ডেঙ্গু। সড়ক দুর্ঘটনা। আমরা স্ক্রল করি। স্ক্রল করতে করতে খাই। প্রেম করি। ঘুমাই। মানুষ সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গেও নিয়েছিল।
এখানে কোনো কিছুর দায় কেউ নেয় না। সেতু ভাঙলে ইঞ্জিনিয়ার নাই। আগুন লাগলে মালিক নাই। পুলিশ গুলি করলে পুলিশ নাই। হাসপাতাল রোগী মারলে ডাক্তার নাই। টিকা না পেয়ে বাচ্চা মরলে প্রশাসন নাই। সবাই গায়েব। শুধু মৃত মানুষটা আছে। এবং তার পরিবার। তারা টিভির সামনে কাঁদবে। রিপোর্টার মাইক ধরবে। জাতি সহানুভূতি জানাবে। তারপর খেলা শেষ।
আমাদের এখানে মৃত্যু এত সস্তা-স্বাভাবিক যে বেঁচে থাকাটাই অশ্লীল। বিশেষত যখন দেখি কোনো মন্ত্রী দাঁত বের করে বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। কোন পরিস্থিতি ভাই? মানুষ তো ভাতের প্লেট নিয়ে বসে নেই যে উল্টে গেল। মানুষ মরছে। অথচ ভাষা দেখুন, দুঃখজনক ঘটনা!
কাম্যু প্লেগ লিখেছিল। সেখানে রোগ ছিল অস্তিত্বের রূপক। আমাদের এখানে রূপকের দরকার নেই। বাস্তবই যথেষ্ট অ্যাবসার্ড। একটা দেশে মানুষ বৃষ্টিতে নেমে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরে। আবার শীতকালে আগুনে পুড়ে। গরমে হিটস্ট্রোক। বর্ষায় ডেঙ্গু। হামে শিশু মারা যায়। সারা বছর সড়ক দুর্ঘটনা বোনাস। এ যেন প্রকৃতি আর রাষ্ট্র যৌথ প্রযোজনায় নাগরিক নিধন কর্মসূচি চালাচ্ছে।
তারপরও মানুষ বেঁচে থাকে। প্রেম করে। বিয়ে করে। সন্তান জন্ম দেয়। হল্লা করে। এটা অলৌকিক। সত্যি। আমি এদেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে অবাক হই। এত বিপর্যয়ের মধ্যেও এরা হাসে কীভাবে! হয়তো অভ্যাস। হয়তো জিনগত মিউটেশন। অথবা মানুষ আসলেই ভয়ংকর রেজিলিয়েন্ট প্রাণী। ডাইনোসর মরে গেছে। কিন্তু বাঙালি এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির চাল কিনছে।
কিন্তু একটা কথা লিখে রাখুন। এই দেশে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন গণতন্ত্র না। উন্নয়নও না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আপনি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কী না! সকালে বের হয়ে রাতে জীবিত ফিরতে পারাটাই এখানে অলৌকিক। বাকিটা পরিসংখ্যান। অথবা শোকবার্তার নির্মম পরিহাস।
দিনহীনের দিনলিপি থেকে




1 মন্তব্যসমূহ
যথার্থ লিখছেন ভাই
উত্তরমুছুনঅমার্জিত মন্তব্য করে কোনো মন্তব্যকারী আইনী জটিলতায় পড়লে তার দায় সম্পাদকের না৷