রিচার্ড ডকিন্সের 'The Selfish Gene' পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে যাই। জিনের স্বার্থপরতার এই তত্ত্ব পড়তে পড়তে মনে হয়, তাহলে কি মানুষও আসলে একটি জৈব যন্ত্র মাত্র? তার নৈতিকতা, তার বিচারবোধ, তার আইন — এসব কি কেবল কিছু প্রোগ্রামিং? তাহলে অপরাধ কি? বিচার কি? ন্যায় কি? এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খায়। ইথিক্স, পলিটিকাল ফিলোসোফি, মেটাফিজিক্স — এই তিনটি শাখাকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টায় যে প্রশ্নগুলো উঠে আসে, সেগুলো আসলে মানবসভ্যতার সবচেয়ে পুরনো এবং এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন। আর যখন কেউ লেখেন — 'ধর্ষণ হলো টিপ অব দি আইসবার্গ' — তখন বুঝি, এই একটি বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই একই প্রশ্নের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। অপরাধের শিকড় কোথায়? শাস্তি কি সমাধান? মানুষ কি স্বভাবতই অপরাধী? আর এই প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে ভাবার চেষ্টা করব — দর্শন, বিজ্ঞান এবং সমাজতত্ত্ব কী বলে!
প্রশ্নটি অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে নৈতিকতার সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন — 'কার ক্ষতি হলে সেটা অনৈতিক?' একজন মানুষ একটি মুরগি কিনে আনলো। সেই মুরগির সাথে যৌনসংগম করল। তারপর জবাই করে রান্না করে খেল। প্রশ্ন হলো — এটা কি নৈতিকভাবে সঠিক, নাকি বেঠিক? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আগে জানতে হবে — আমরা নৈতিকতা বলতে কী বুঝি?
ক. পরিণতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Consequentialism)
জেরেমি বেন্থাম এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের উপযোগবাদ (Utilitarianism) বলে — যে কাজে সর্বোচ্চ সুখ এবং সর্বনিম্ন কষ্ট হয়, সেটাই নৈতিক। এখানে প্রশ্ন আসে — মুরগির কষ্ট কি গণনায় আসে? বেন্থাম বলেছিলেন বিখ্যাত এক বাক্যে: 'The question is not, Can they reason? nor, Can they talk? but, Can they suffer?' (Jeremy Bentham, An Introduction to the Principles of Morals and Legislation, 1789)।
মুরগি ব্যথা অনুভব করতে পারে। সে যন্ত্রণা পেতে পারে। তাই উপযোগবাদের দৃষ্টিতে এই কাজটি অনৈতিক — কারণ এতে একটি অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণীর কষ্ট বৃদ্ধি পায়, আনন্দ নয়।
খ. কান্টীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Deontology)
ইমানুয়েল কান্ট বলেন, নৈতিকতা হলো 'কর্তব্য'। তাঁর Categorical Imperative-এর দ্বিতীয় সূত্র: 'Act in such a way that you treat humanity, whether in your own person or in the person of any other, never merely as a means to an end, but always at the same time as an end.' (Kant, Groundwork of the Metaphysics of Morals, 1785)।
কান্ট মূলত মানুষ সম্পর্কে বলেছেন, কিন্তু পরবর্তী দার্শনিকরা এটিকে প্রসারিত করেছেন। Christine Korsgaard তাঁর 'Fellow Creatures: Our Obligations to the Other Animals' (2018) গ্রন্থে দেখিয়েছেন — প্রাণী নিজের জন্যই মূল্যবান, কোনো বাহ্যিক উদ্দেশ্যের সেবক হিসেবে নয়।
তাই কান্টীয় দৃষ্টিতেও এই কাজটি একটি সংবেদনশীল প্রাণীকে নিছক যৌন বস্তু বা খাদ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করার দায়ে দুষ্ট।
গ. প্রাকৃতিক আইন ও 'Harm Principle'
জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর 'On Liberty' (1859) গ্রন্থে বলেছেন — রাষ্ট্র বা সমাজ কেবল তখনই কারো স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, যখন তার কাজ অন্য কারো ক্ষতির কারণ হয়। তাহলে প্রশ্ন উঠে — মুরগি কি 'অন্য কেউ'?
আধুনিক প্রাণী অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ Peter Singer তাঁর 'Animal Liberation' (1975) গ্রন্থে যুক্তি দেখান — 'speciesism' বা প্রজাতিভিত্তিক বৈষম্য ততটাই অযৌক্তিক যতটা জাতিভেদ বা লিঙ্গভেদ। একটি প্রাণী যদি কষ্ট পেতে পারে, তাহলে তার কষ্টকে উপেক্ষা করার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।
তাহলে উত্তর স্পষ্ট — নৈতিকতার যেকোনো সংজ্ঞা অনুসারে এই কাজটি অনৈতিক। শুধু তাই নয়, এটি মানসিক বিকৃতির লক্ষণও। কারণ যে মন একটি অসম্মতিসম্পন্ন, অসহায় প্রাণীর সাথে যৌনাচারে সক্ষম, সেই মন ক্ষমতার বিকৃত ব্যবহারে অভ্যস্ত। আর এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে — ধর্ষণও সেই একই ক্ষমতার বিকৃতি। যৌনতা এখানে আনন্দের মাধ্যম নয়, আধিপত্যের অস্ত্র।
ক্রিমিনোলজির সবচেয়ে পুরনো বিতর্ক এটি। মানুষ কি জন্মগতভাবেই অপরাধী? নাকি পরিবেশ, পরিস্থিতি আর সমাজ তাকে অপরাধী বানায়?
ক. জৈব-নির্ধারণবাদ: Cesare Lombroso ও 'Born Criminal'
ইতালীয় চিকিৎসক Cesare Lombroso ১৮৭৬ সালে তাঁর 'L'Uomo Delinquente' গ্রন্থে দাবি করেন — অপরাধীদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হয়। তাদের মাথার আকৃতি, চোয়াল, কান — এসব থেকে নাকি অপরাধপ্রবণতা বোঝা যায়। এটি ছিল 'Atavism' তত্ত্ব — অপরাধী মানে বিবর্তনে পিছিয়ে পড়া মানুষ।
পরবর্তীতে এই তত্ত্ব বহুলাংশে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে এর উত্তরাধিকার আজও আছে জেনেটিক ক্রিমিনোলজিতে। ১৯৯৩ সালে গবেষকরা 'MAOA জিন' বা 'Warrior Gene'-এর সন্ধান পান — যেটির একটি নির্দিষ্ট রূপ উচ্চমাত্রার আগ্রাসনের সাথে যুক্ত বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। (Brunner et al., 1993, Science Journal)। কিন্তু এখানে সতর্কতা জরুরি। একটি জিন সরাসরি অপরাধ ঘটায় না। ডকিন্স নিজেই তাঁর 'The Selfish Gene' (1976) গ্রন্থে বলেছেন — জিন 'selfish' হলেও মানুষ 'selfless' হতে পারে। জিন আমাদের প্রভাবিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে না।
খ. সামাজিক নির্মাণবাদ: Emile Durkheim ও Anomie তত্ত্ব
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী Emile Durkheim তাঁর 'The Rules of Sociological Method' (1895) ও 'Suicide' (1897) গ্রন্থে দেখালেন — অপরাধ আসলে সমাজের একটি স্বাভাবিক উপজাত। 'Anomie' ধারণাটি তিনি দেন — যখন সমাজের নিয়মকানুন ভেঙে পড়ে বা মানুষ তার লক্ষ্য ও প্রাপ্তির মাঝে বিশাল ফারাক দেখে, তখন অপরাধ বাড়ে।
Robert Merton (১৯৩৮) এই তত্ত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে বললেন — আমেরিকান সমাজ 'সাফল্য'কে লক্ষ্য হিসেবে শেখায়, কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর সমান সুযোগ দেয় না। ফলে বঞ্চিত মানুষেরা 'উদ্ভাবনী' পথে — মানে অপরাধের পথে — লক্ষ্য পূরণ করতে চায়।
গ. ডকিন্স ও মিম তত্ত্ব
ডকিন্স 'The Selfish Gene'-এ শুধু জিনের কথা বলেননি। তিনি 'meme' ধারণাটিও দিয়েছেন — সংস্কৃতির ক্ষুদ্রতম একক, যা জিনের মতোই ছড়ায় এবং টিকে থাকে। একটি মেম হতে পারে একটি ধারণা, একটি সুর, একটি অভ্যাস।
অপরাধের মেমও এভাবে ছড়ায়। সহিংসতার সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের মেম, নারীকে ভোগ্যপণ্য মনে করার মেম — এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজে প্রবাহিত হয়। স্কুলে, মসজিদে, সিনেমায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় — সর্বত্র।
তাহলে উত্তর হলো: দুটোই সত্য, কিন্তু পরিবেশের ভূমিকা অনেক বেশি। জিন সম্ভাবনা তৈরি করে, সমাজ সেটিকে বাস্তব করে। একটি মানুষ আগ্রাসী জিন নিয়ে জন্মালেও যদি সে মানবিক পরিবারে, সুশিক্ষায়, সমতার পরিবেশে বড় হয় — সে অপরাধী হয় না। আর একটি শিশু আদর্শ জিন নিয়ে জন্মেও যদি বঞ্চনায়, হিংসায়, অবহেলায় বড় হয় — সে বিপথে যেতে পারে।
ক্রিমিনোলজির এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় 'Biosocial Criminology' — জৈব ও সামাজিক কারণের সংমিশ্রণ। (Fishbein, 1990; Walsh & Beaver, 2009)।
কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, মোহ, অহংকার — এগুলোকে বাংলা সংস্কৃতি ও হিন্দু দর্শনে 'ষড়রিপু' বলা হয়। বৌদ্ধ দর্শনে এগুলো 'কিলেসা' বা মানসিক দূষণ। ইসলামে 'নফসে আম্মারা' — কুপ্রবৃত্তির দিকে আহ্বানকারী সত্তা। আর পশ্চিমা খ্রিস্টান ঐতিহ্যে 'Seven Deadly Sins'।
কিন্তু প্রশ্ন হলো — বিবর্তনের দৃষ্টিতে এই প্রবৃত্তিগুলো কেন আছে?
ক. ডারউইন ও বেঁচে থাকার যুক্তি
ডকিন্সের তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি জীব আসলে তার জিনের 'বাহন'। জিনের একটাই লক্ষ্য — নিজেকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া। এই লক্ষ্যে সহায়ক যা কিছু, তা-ই টিকে থাকে।
কাম — প্রজনন নিশ্চিত করে। ক্রোধ — বিপদে লড়াই করতে সাহায্য করে। লোভ — সম্পদ সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়। হিংসা — প্রতিযোগীকে সরিয়ে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা। মোহ — পরিচিত ও নিরাপদ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। অহংকার — সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখার হাতিয়ার।
এগুলো আসলে বিবর্তনগত সুবিধা নিয়ে এসেছিল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এগুলো মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে।
খ. তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা হলো — আজকের সমাজ সেই প্রাচীন পরিবেশ নয়। আমাদের মস্তিষ্ক এখনো সেই হাজার বছর আগের 'সফটওয়্যার' চালাচ্ছে, কিন্তু পরিবেশ বদলে গেছে। ক্রোধ একসময় বাঘের মুখ থেকে বাঁচাত, এখন রাস্তায় গলা কাটায়। কাম একসময় প্রজননের সেবা করত, এখন মাঝে মাঝে ধর্ষণে পরিণত হয়।
নিউরোসায়েন্টিস্ট Robert Sapolsky তাঁর 'Behave: The Biology of Humans at Our Best and Worst' (2017) গ্রন্থে দেখিয়েছেন — আমাদের Prefrontal Cortex (যুক্তি ও নৈতিকতার কেন্দ্র) এবং Limbic System (আবেগের কেন্দ্র) সর্বদা দ্বন্দ্বে থাকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং পরিবেশ নির্ধারণ করে কে জিতবে।
গ. অপরাধের কেন্দ্রে এই প্রবৃত্তিগুলো কেন?
কারণ এই প্রবৃত্তিগুলো যখন অনিয়ন্ত্রিত হয়, যখন এগুলোর লাগাম টানার ব্যবস্থা সমাজে থাকে না — তখন অপরাধ জন্ম নেয়। একটি পুরুষের মধ্যে কামের যে জৈব টান, সেটা অপরাধ না — সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু যে সমাজ শেখায়নি যে 'না মানে না', যে সমাজ নারীকে ভোগ্য বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে, যে সমাজে কামের পূর্ণ ও সুস্থ প্রকাশের জায়গা নেই — সেখানে কাম বিকৃত হয়ে ধর্ষণ হয়।
'রসিক ও রোমান্টিক পুরুষের দ্বারা ধর্ষণ অসম্ভব।' কারণ রসিকতা ও রোমান্টিকতা মানে অপরজনের অনুভূতিকে বোঝার ক্ষমতা — empathy। এই empathy যে সমাজে নেই, সেখানে কামের জায়গায় হিংস্রতা আসে।
নীতি এবং নৈতিকতা — এ দুটো শব্দ শুনলে মনে হয় এরা বাতাসে ভাসছে। কারো বানানো নয়, চিরকালের জন্য বিদ্যমান। কিন্তু সত্যিই কি তাই?
ক. নৈতিকতার উৎস: ঈশ্বর নাকি মানুষ?
প্লেটোর 'Euthyphro Dilemma' থেকে এই প্রশ্ন শুরু: 'কোনো কাজ কি ভালো কারণ ঈশ্বর চান, নাকি ঈশ্বর চান কারণ কাজটি ভালো?' এই দ্বিধার মানে হলো — ঈশ্বর থেকে নৈতিকতা স্বাধীন। ডকিন্স তাঁর 'The God Delusion' (2006) গ্রন্থে দেখান যে নৈতিকতার বিবর্তনীয় ভিত্তি আছে। সামাজিক প্রাণী হিসেবে আমাদের সহযোগিতা করার প্রবণতা — যা পরস্পর উপকারী — বিবর্তনের ফসল। অর্থাৎ 'ভালো করো অন্যের সাথে' কারণ এতে তোমারও লাভ। এটাকে বলে 'Reciprocal Altruism'।
কিন্তু এই বিবর্তনীয় নৈতিকতা কি যথেষ্ট? জার্মান দার্শনিক Friedrich Nietzsche বলেছিলেন — প্রচলিত নৈতিকতা আসলে 'দাসদের নৈতিকতা' (Slave Morality)। দুর্বলরা শক্তিশালীদের নিয়ন্ত্রণ করতে এই নৈতিকতার আবিষ্কার করেছে। (Beyond Good and Evil, 1886)।
খ. পুঁজিবাদ ও নৈতিকতার সম্পর্ক
কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন — 'The ideas of the ruling class are in every epoch the ruling ideas.' (The German Ideology, 1845)। অর্থাৎ যে শ্রেণি অর্থনৈতিক ক্ষমতায় থাকে, তারাই নির্ধারণ করে কোনটা 'নৈতিক' আর কোনটা 'অনৈতিক'।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় 'সম্পত্তির অধিকার' পবিত্র, 'শ্রমিকের অধিকার' আলোচনাসাপেক্ষ। নারীর শরীর বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা 'ব্যবসায়িক স্বাধীনতা', কিন্তু সেই নারীর ওপর হওয়া সহিংসতার বিচার হয় না বছরের পর বছর। এই দ্বিচারিতা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চরিত্র।
Michel Foucault তাঁর 'Discipline and Punish' (1975) গ্রন্থে দেখিয়েছেন — আধুনিক আইন ও বিচারব্যবস্থা আসলে ক্ষমতার কাঠামো। কারাগার, পুলিশ, আদালত — এগুলো শুধু অপরাধ ঠেকানোর হাতিয়ার নয়, এগুলো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রও।
গ. তাহলে নৈতিকতা কি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক?
এটা মেটাএথিক্সের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। 'Moral Relativism' বলে — নৈতিকতা সংস্কৃতি ও সময়ের সাথে বদলায়। একসময় দাসত্ব 'নৈতিক' ছিল, এখন নয়। একসময় নারীর ভোটাধিকার 'অনৈতিক' ছিল, এখন সেটা অধিকার।
কিন্তু 'Moral Realism' বলে — কিছু নৈতিক সত্য বস্তুনিষ্ঠ। কষ্ট দেওয়া খারাপ — এটা কোনো সংস্কৃতিতেই ভালো ছিল না, শুধু ক্ষমতাশালীরা এটা স্বীকার করতে চায়নি।
আমার মত হলো: নৈতিকতার একটি শক্ত ভিত্তি আছে — কষ্ট ভোগ করার সক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো সত্তার সাথে সহানুভূতিশীল আচরণ। বাকিটা নির্মাণ, এবং সেই নির্মাণে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশাল ভূমিকা আছে — প্রায়ই নেতিবাচক।
মানুষ কেন রাষ্ট্রের কাছে মাথা নোয়ায়? কেন সে তার কিছু স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়? এই প্রশ্নের সেরা উত্তর দিয়েছিলেন সপ্তদশ শতকের দার্শনিকরা — তাঁদের 'Social Contract Theory' দিয়ে।
ক. হব্স, লক ও রুশো: তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি
টমাস হব্স তাঁর 'Leviathan' (1651) গ্রন্থে বললেন — রাষ্ট্রের আগে মানুষের জীবন ছিল 'solitary, poor, nasty, brutish and short।' সবাই সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধ থেকে বাঁচতে মানুষ একটি শক্তিশালী সার্বভৌম শক্তির কাছে তার অধিকার সমর্পণ করে।
জন লক তাঁর 'Two Treatises of Government' (1689) গ্রন্থে ভিন্নমত দিলেন। তিনি বললেন — মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থা এত খারাপ ছিল না। রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে তিনটি প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য: জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি। রাষ্ট্র যদি এই কাজ না করে, তাহলে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত।
জ্যাঁ-জ্যাক রুশো 'The Social Contract' (1762) গ্রন্থে বললেন — 'Man is born free, and everywhere he is in chains।' তিনি মনে করতেন, সমাজই মানুষকে নষ্ট করেছে। আদিম মানুষ 'Noble Savage' ছিল — স্বাভাবিক এবং নির্মল।
খ. বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে মানুষ নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কাছে গেছে — কিন্তু পেয়েছে কি? নুসরাতের বিচারে বছর লেগেছে। তনুর ন্যায়বিচার এখনো হয়নি। মুনিয়ার মৃত্যু রহস্যই রয়ে গেছে। রামিসার ঘটনায় প্রতিবাদ জ্বলে উঠল, কিন্তু ব্যবস্থার মূলে কোনো পরিবর্তন হলো কি?
Transparency International Bangladesh-এর গবেষণা দেখায় — বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতির মাত্রা উদ্বেগজনক। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে বিচার পাওয়া কঠিন। ক্ষমতাশালীর বিরুদ্ধে মামলা করা আরও কঠিন।
লকের ভাষায় বলতে হয় — যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ।
গ. দায় কার?
সহজ উত্তর হলো — রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র তো বিমূর্ত। রাষ্ট্র মানে সেই মানুষগুলো যারা ক্ষমতায় আছে, যারা আইন বানায়, যারা আইন প্রয়োগ করে।
আরও গভীরে গেলে — দায় আমাদের সবার। আমরা যে সমাজ তৈরি করেছি, যে নীরবতা মেনে নিয়েছি, যে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম মেনে চলেছি — সেই সামষ্টিক দায় থেকে কেউ মুক্ত নয়।
Hannah Arendt তাঁর 'The Origins of Totalitarianism' (1951) গ্রন্থে 'the banality of evil' ধারণা দিয়েছিলেন। মহা অপরাধ ঘটে না কেবল দানবদের হাতে — বরং ঘটে সাধারণ মানুষের নীরব সম্মতিতে, প্রশ্নহীন আনুগত্যে।
বিচারক আইন প্রয়োগ করেন। কিন্তু বিচারক নিজে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন? তাঁকে কে বিচার করে?
ক. আইনের সীমা
আইন লিখিত, মানুষ জটিল। আইন স্থির, পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। H.L.A. Hart তাঁর 'The Concept of Law' (1961) গ্রন্থে দেখান — আইনের ভাষায় সবসময় অস্পষ্টতা থাকে। বিচারককে সেই অস্পষ্ট জায়গায় নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে হয়।
Ronald Dworkin তাঁর 'Taking Rights Seriously' (1977) গ্রন্থে যুক্তি দেন — আইন শুধু নিয়মের সমষ্টি নয়, এর মধ্যে নীতিও আছে। বিচারক সেই নীতি থেকে গাইডেন্স নেন।
খ. বিচারক মানুষ
বিচারক নিরপেক্ষ নন। তিনি একটি সমাজের সন্তান, একটি শ্রেণির প্রতিনিধি, একটি সংস্কৃতির বাহক। তাঁর রায়ে তাঁর পক্ষপাত প্রকাশ পায় — চেতনে বা অচেতনে।
Critical Legal Studies আন্দোলন ১৯৭০-এর দশকে এই প্রশ্ন তুলেছিল জোরালোভাবে। Duncan Kennedy ('Legal Education and the Reproduction of Hierarchy', 1983) দেখান — আইন শিক্ষাই মূলত ক্ষমতার কাঠামোকে পুনরুৎপাদন করে।
বাংলাদেশে এই সমস্যা আরও প্রকট। ধর্ষণ মামলায় প্রায়ই ভুক্তভোগীর 'চরিত্র' বিচার হয়। আদালতে প্রশ্ন ওঠে — 'সে কী পরেছিল?', 'সে কি একা যাচ্ছিল?'। এই প্রশ্নগুলো দেখায় — বিচারব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিক পক্ষপাত কতটা গভীরে।
গ. তাহলে বিচারকের বিচার কে করে?
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে — উচ্চ আদালত, আপিল বিভাগ। কিন্তু সেই বিচারকদের বিচার কে করে? একটি অন্তহীন প্রতিক্রমণ (infinite regress) শুরু হয়।
Aristotle এই সমস্যার কথা জানতেন। তাই তিনি বলেছিলেন — 'Law is reason unaffected by desire।' কিন্তু 'reason' নিজেও মূল্যনিরপেক্ষ নয়। কার reason? কার perspective?
আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তর হলো — জনগণ। মিডিয়া। নাগরিক সমাজ। এরাই বিচারকের বিচার করে — পরোক্ষভাবে হলেও। কিন্তু এই ব্যবস্থাও নিখুঁত নয়।
ফলে আমরা এক গভীর দার্শনিক সত্যে পৌঁছাই — কোনো আইন বা বিচারব্যবস্থাই চূড়ান্ত নৈতিক কর্তৃপক্ষ হতে পারে না। ন্যায়বিচারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আইনের পাশাপাশি একটি নৈতিক সমাজ, একটি সচেতন নাগরিক সমাজ, এবং ক্রমাগত সমালোচনা ও সংশোধনের সংস্কৃতি দরকার।
রূপকটি আবার মনে পড়ে ধর্ষণ হলো 'টিপ অব দি আইসবার্গ।' হিমবাহের বেশিরভাগ অংশ জলের নিচে — অদৃশ্য। সেই অদৃশ্য অংশ কী? যৌনশিক্ষার অনুপস্থিতি। নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার সংস্কৃতি। পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের শিক্ষা। ক্ষমতার অপব্যবহারকে 'পুরুষত্ব' মনে করার বিকৃতি। আইনের দুর্বলতা ও বিচারের বিলম্ব। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নৈতিক শূন্যতা। ডকিন্স বলেছিলেন — 'We are built as gene machines... but we have the power to turn against our creators।' আমাদের জিন, আমাদের প্রবৃত্তি — এগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু আমরা, মানুষ হিসেবে, সেগুলোকে অতিক্রম করার ক্ষমতাও রাখি।
সেই ক্ষমতার নাম — শিক্ষা। সচেতনতা। সহানুভূতি। এবং সাহস — প্রশ্ন করার, বলার, বদলানোর।
ফাঁসি দিলে একজন ধর্ষক মারা যায়। কিন্তু যে সমাজ ধর্ষক তৈরি করে, সেই সমাজ বদলায় না। ক্রসফায়ারে একটি শরীর ঠান্ডা হয়। কিন্তু সেই মন যে বিকৃতি ছড়িয়ে দিয়েছে, সে বেঁচে থাকে — অন্য কারো মধ্যে।
তাই আইন দরকার — কঠোর, দ্রুত, নিরপেক্ষ আইন। কিন্তু আরও বেশি দরকার একটি সমাজ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
প্লেটোর 'Republic'-এ সক্রেটিস বলেছিলেন — 'Justice is not about external actions. It is about the health of the soul — of the individual, and of the city.' ধর্মীয় ভাষায় বলি — আমার আত্মার স্বাস্থ্য এবং আমার সমাজের স্বাস্থ্য অবিচ্ছেদ্য। একটি অসুস্থ সমাজে কোনো ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে পারে না।
এই দীর্ঘ প্রশ্নযাত্রার শেষে যদি একটিই উত্তর দিতে হয়, সেটা হলো: মানুষ অপরাধী হয়, কিন্তু তাকে বানানো হয়। তার বিচার দরকার, কিন্তু তার চেয়ে বেশি দরকার সেই কারখানার সংস্কার — যে কারখানায় অপরাধী তৈরি হয়।
সেই কারখানার নাম — আমাদের সমাজ।
তথ্যসূত্র ও আরও পড়ার জন্য
মূল গ্রন্থসমূহ
1. Dawkins, Richard. The Selfish Gene. Oxford University Press, 1976.
2. Darwin, Charles. On the Origin of Species. John Murray, 1859.
3. Kant, Immanuel. Groundwork of the Metaphysics of Morals. 1785.
4. Bentham, Jeremy. An Introduction to the Principles of Morals and Legislation. 1789.
5. Mill, John Stuart. On Liberty. John W. Parker & Son, 1859.
6. Mill, John Stuart. Utilitarianism. Parker, Son, and Bourn, 1863.
7. Plato. The Republic. Circa 375 BCE.
8. Hobbes, Thomas. Leviathan. Andrew Crooke, 1651.
9. Locke, John. Two Treatises of Government. Awnsham Churchill, 1689.
10. Rousseau, Jean-Jacques. The Social Contract. 1762.
11. Nietzsche, Friedrich. Beyond Good and Evil. 1886.
12. Marx, Karl & Engels, Friedrich. The German Ideology. 1845 (published 1932).
13. Durkheim, Émile. The Rules of Sociological Method. Félix Alcan, 1895.
14. Foucault, Michel. Discipline and Punish. Gallimard, 1975.
15. Arendt, Hannah. The Origins of Totalitarianism. Schocken Books, 1951.
16. Hart, H.L.A. The Concept of Law. Oxford University Press, 1961.
17. Dworkin, Ronald. Taking Rights Seriously. Harvard University Press, 1977.
18. Singer, Peter. Animal Liberation. New York Review/Random House, 1975.
19. Sapolsky, Robert M. Behave: The Biology of Humans at Our Best and Worst. Penguin Press, 2017.
20. Korsgaard, Christine M. Fellow Creatures: Our Obligations to the Other Animals. Oxford University Press, 2018.
21. Kennedy, Duncan. Legal Education and the Reproduction of Hierarchy. 1983.
22. Brunner, H.G. et al. 'Abnormal Behavior Associated with a Point Mutation in the Structural Gene for Monoamine Oxidase A.' Science, 1993.
23. Lombroso, Cesare. L'Uomo Delinquente. Hoepli, 1876.
24. Merton, Robert K. 'Social Structure and Anomie.' American Sociological Review, 1938.
25. Dawkins, Richard. The God Delusion. Bantam Books, 2006.
শামীম সৈকত
স্নাতকোত্তর, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।




0 মন্তব্যসমূহ
অমার্জিত মন্তব্য করে কোনো মন্তব্যকারী আইনী জটিলতায় পড়লে তার দায় সম্পাদকের না৷