কবিতায় নিবেদিত প্রাণ, প্রতিশ্রুতিশীল কবি মোকলেছুর রহমান এর নতুন কবিতার বই ‘শেষ দৃশ্যের নায়ক’ অমর একুশে বইমেলা-২০২৪ এ প্রকাশিতব্য। সমসাময়িক সময়ে লেখা পাঠকের হৃদয় স্পর্শী কবিতা দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘শেষ দৃশ্যের নায়ক’ কাব্যগ্রন্থটি। যা হয়তো পাঠকদের মনন ছুঁতে সক্ষমতা অর্জন করবে।

প্রকাশক: ঘাসফুল প্রকাশনী।
প্রচ্ছদ: সাহাদাত হোসেন।
ঘাসফুল প্রকাশনীর ১৪৭-১৪৮ স্টলে পাওয়া যাবে।

মশারির কারাগার

ডাইনোসরের রাজত্ব শেষ হয়েছে কবেই,
যাদুঘরে সজ্জিত তার
একাধিপত্যের ফসিল।

সিন্ধু, মায়ান, ট্রয় নগরীর
ধ্বংসাতিহাসের ছাপ এখনো লেগে পৃথিবীর গায়ে।  ইতিহাস পাল্টে যায়,
রাজত্বের বদল হয়,
ক্ষমতা থাকে না চির দিন একমুঠি তলে
                            কালানুক্রমিক বিবর্তনে।

প্রাণীর রাজ্যে মানুষ নিজেকে রাজা ভেবে,
প্রতিপক্ষকে বন্দি করে,
বাঘ-সিংহ খাঁচায় ভরে,
হায়না-কুমিরও খাঁচায় রেখে অসীম সাহসের তর্জন-গর্জনে আকাশ ফাঁটায়ে ফেলে।

আহারে  মানুষ
এ্যারোসল মারো, মশা ল্যাম্প, ধাতব কয়েল, কয়েলের ধোঁয়া ছাড়,
পালানোর পথ ঘিরে রাখে এনসেফালাইটিস,
ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া ভাইরাসে।

ক্ষুদ্র মশা'র কাছে
ধরাশায়ী, আতঙ্কে মানুষ নিজেই
বন্দি হয় মশারির কারাগারে।

হাজার হাজার বছরের
মানুষের রাজত্বে ক্ষুদে জীবাণুর
জয় ঢাক বাজে।


তেলী পাড়া

ভোজন রসিক হিসাব কষে না, রন্ধন শিল্পে
কত ফোঁটা শরীরের জল ঝরলে তা
কত লিটার তেল হয়ে রন্ধনে স্বাদ যোগাবে?
সে তো ভোজনে পরম-তৃপ্তি খোঁজে!

বাজারে খাঁটি তেলের সংকট হলেও
তেলী পাড়ায় তা অ্যাভেলএ্যাবেল,
ঘানিতে ভাঙানোর অধিক খাঁটি;
তাদের মুখে তেল ভর্তি ওয়াগন, আনলোড করে করে,
যেন ডিপো বানিয়ে রেখেছে।

যখন যেখানে যে অবস্থায় আখের গোছাতে-
যার মুখে, শরীরে, পায়ে গ্যালন-গ্যালন
লোড দিতে হয়;  সব যেন নখ দর্পনে।

শহর বা গ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে টাই পরা, ইন করা, লুঙ্গি খেঁচা, উচ্চ-মধ্য-অল্প, বয়স ও শিক্ষিত, 
ঘানি নয় ডিপো খুলে বসেছে-
যারা অধিক তেলপ্রীতিতে তৈলাক্ত হওয়ার বাসনা আছে চলে যান না হয়,
আধুনিক তেলী পাড়ায়- আঁচার হয়ে ডুবে থাকেন তেলে।


চোখের ফ্রেমে বন্দি  হয়ে যাও


চোখের আলো নিভে গেলে
মনের আলো খুঁজে নিবে তোমায়,
ঘন কুয়াশায় দুরপাল্লার বাসে যেতে যেতে
গন্তব্য যেমন
                   আস্তে
                          আস্তে
                                 আস্তে
স্পষ্ট নিকটবর্তী হয়
সেভাবে তুমি চোখের ফ্রেমে বন্দি হয়ে যাও।


ভাড়া

১.
দ্রব্যের বাজারে
নিত্য আগুন লেগে, মাথায় হাত ঠেকে!

ভাড়া চুকাতে
পকেটে আগুন লাগা, সবার গা-সয়ে গেছে।

বাস ভাড়া বাড়ে, ট্রেনের ভাড়া বাড়ে,
প্লেন ভাড়া, লঞ্চের ভাড়া বাড়ে,
কারণে অকারণে
উৎসব আর ছুটিতে।

হরতাল-অবরোধ-ধর্মঘটে,
এদেশে--
বাহনের ভাড়া বাড়ে
সেবার মান বাড়ে না,
জীবনের মান বাড়ে না।
মানবিকতার হত্যা বাড়ে,
অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ে
মানবিকতার চর্চা বাড়ে না।

শেষ কৃত্যাস্থানের জৌলুস বাড়ে
টাইলস্ আর মার্বেল পাথরে।
জীবিতদের আবাস ধ্বসে পড়ে,
মৃত চিন্তার বিপুল কষাঘাতে!

পরিত্যক্ত, দরপত্রে কেনা
কল-কব্জার অ্যাসেম্বলিতে
ছুটে চলা মাইক্রোবাস,
এম্বুলেন্সের ব্যানার সেটে,
মুমূর্ষু রোগী টানে;
শুশ্রূষার ব্রেডে না পৌছালেও--
পৌছে হাসপাতালের মর্গে।

নিশুতি রাতে ডিসফেনসারিতে
ঔষুধের দাম বাড়ে।
বিয়ের মৌশুমে অলংকারের,
পশু কোরবানীর উৎসবে
কামারের কাটারির দাম বাড়ে।

২.
রিক্সা ভাড়া বাড়ে
ঝড়-বৃষ্টি,
শীতে-শৈত্যপ্রবাহ কালে
আরো চৈত্রের তাপদাহে।

মধ্যরাতে, ভোরে
বাহন শূন্য রাস্তায়,
গন্তব্য ব্যাকুল নিরুপায় যাত্রীর
গলায় ছুরি ওঠে, ভাড়া বাড়ানোর।

জনসভা, ধর্মসভা, শোক সভাস্থলে,
পাঠশালা, অফিস চত্ত্বরে-
রিক্সা ভাড়া বাড়ে।

মেলা বাড়ি, বিয়ে বাড়ি,
আবার,
পার্কের উপচে পড়া ভিড়ে,
রিক্সা ভাড়া বাড়ে।

শহর বা পাড়ার মোড়ের
রিক্সাওয়ালারা,
যাত্রীর পকেটের  উষ্ণতা মেপে,
মুখ দেখে রিক্সায় টানে।

ঠাণ্ডা পকেটের যাত্রীদ্বয়
পায়ে হেটে, অলিখিত ভাড়া চুক্তিতে
রিক্সায় গন্তব্যে ছোটে।

রোগী, বিপদগ্রস্থ,
পরীক্ষার্থী দেখলে
লুম্পেন রিক্সাওয়ালাদের
তিন-চারগুণ ভাড়া বাড়ে,
আমাদের বার মাসের তের পার্বণে।


পথ

গন্তব্যে পৌছে যাই
যে যার মতো,
                পৃথিবীর পথে
                               অভিষ্ঠ লক্ষে।

পথটা সঠিক হলে
ঠিকই!
পথ নিজেই,
দুরের পথকে চিনিয়ে দেয়।

ভ্রান্ত পথের যাত্রা
গাড়দে মিলায়,
সকল বাঞ্চা
পথেই লুটোপুটো!


পাথর

মহাবিস্ফোরণে ছিটকে পড়া
শীলার মাত্রাহীন শোকই পাথর,
অক্সিজেনের সুকরুন দীর্ঘশ্বাস
কার্বনে লেগে-লেগে।
আলোকবর্ষী ধ্যানে,
শোক কাটে না তবু;
চির স্থবির মহাকালের ক্রোড়ে।

পাথর,
কারো তো বুকে গড়িয়ে ওঠে না,
ব্যর্থ প্রেমিকেরা পথের পাথর তুলে
চেপে রাখে হারানো প্রেমিকা ভেবে।


কাঁটাতার

অখন্ড আকাশ
সবুজ পৃথিবীটারে,
খন্ড খন্ড অংশে বিভক্ত রেখা টেনে
কাঁটাতার বসিয়ে দিয়েছে বিশ্ব মোড়লেরা।
আমরা মানবজাতি থেকে
ভাষা-ধর্ম, বর্ণ বিভক্তিতে
বিভক্ত!
            হয়ে!
                          হয়ে
বহুজাতিক হয়ে গেলাম।

পাখিরা চাইলে উড়তে পারে
গোটা আকাশ,
মানুষ পারে না
নিজেদের অসীম সীমানায়
বসিয়ে দিয়েছে কাঁটাতার।


দুষ্কাল

পাল্টে যায় সব কিছু

নদীর ধারা, বাতাসের ভাষা,

কিংবা ধরো অবস্তুগত ভালোবাসাও।

চিন্তার বুদবুদ।

পাতার সবুজ, আকাশের নীল, 

প্রিয় মানুষের মুখাবয়ব, 

মুষ্ঠিবদ্ধ সময়।


চিটাররা সব এক হয়

সাধুদের যত বিভাজন,

পায়ে পিষে চলা প্রেম

হাতে-হাতে সম্পর্কের রক্ত!

চিটাররা সব এক হয়

সাধুদের যত বিভাজন।


অবাধ্য জল আর 

দিগন্ত ছোঁয়া নদীর হর-গৌরীর প্রেম

তারই মাঝে জাগায়ে চর

একই জলকে করছে পর।

একটা ধারা

চোরা-স্রোতে মিশে 

খেলে অবিশ্বাসের খেলা-

চিটাররা সব এক হয়

সাধুদের যত বিভাজন।


নাইট কুইন

পাতার যোনিতে জন্ম

ক্যাকটাসের স্বভাবে।


চর্তুদশ দিনে কলি

ফুল হয়ে ফোটে

শিল্পকলার বিরলতম নন্দনে।


দিনের মহিমাকে ব্যর্থ করে দিয়ে, 

দুধের উজ্জ্বলতায়

রাতের বুকে !


পৌরানিক গল্প-গাথায় 

যিশু খ্রিস্টের জন্মোৎসবে,

'বেথেলহ্যাম ফ্লাওয়ার’, 

ব্রহ্মার পুত্ররূপে 'ব্রহ্মাকামালাম’

নামে।


মাদকতায় থমকে দাও 

মুগ্ধতার অনিন্দ্য প্রতিবেশে।


পাপড়ি ডানা নাড়ে, ঝরে

রাত্রি শেষ হতে না হতে,

মুহূর্তুের আয়ু নিয়ে সৌভাগ্যের প্রতীকে! 

নাইট কুইন।



শ্রম


পেটে হাত দিলে

গলা ধরে ফেলবো, 

শ্রম বেচে খাই

হাত পাতি না।