New

শ্বেতপত্র

দাগ : আহম্মেদুল কবির


চিলমারী যাবে বলে সকাল থেকে আগুনের প্রস্তুতি চলছে। ধোয়া কাপড় লন্ড্রী করা, এলোচুলে তেল দেয়া এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না হেয়ার ব্রাশে চুলের দেখা মেলে ততক্ষণ পর্যন্ত আগুনের প্রস্তুতির জট যেন খুলছে না। তার কান্ডকারখানা দেখে আজাদ মনে মনে ক্ষিপ্ত হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে আগুন। কিন্তু কী করবে সে? আয়নায় নিজের নয় কুৎসিৎ চেহারা ঠিকঠাক দেখতে না পারায় চিলমারী যাবার বাসনা আগুনের প্রায় ক্ষান্ত হচ্ছিল। তবে আজ চিলমারী যেতে না পারলে আজাদের ব্যবসায় যে ক্ষতি হবে আর সে দায়ভার সারাটা জীবন তাকেই বহন করতে হবে সেটা ভেবে যেতেই হচ্ছে আগুনকে।


আজাদ পিতা-মাতার বড় আদরের ছেলে, তাদের স্নেহ-ভালোবাসা ত্যাগ করে শুধুমাত্র জীবনের তাগিদে এবং আগুনের ভরসায় ছুটে এসেছে এই কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীতে। পিতার সারাজীবনের কষ্টার্জিত পেনশনের টাকা তুলে নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে আজাদ। সে ব্যবসাটি শুরু করতে চায়নি, তার পিতামাতা, ভাইবোনের বিশ্বাস আগুনের মতো এমন সৎ ও ভদ্র ছেলের সহযোগিতায় ব্যবসা করলে আজাদ ঠিকই একদিন সংসারী হবে, না হলেও বকে যাবে না। এরকম চিন্তা ভাবনা করে আজাদের পিতামাতা আজাদকে আগুনদের শহরে পাঠিয়েছে ব্যবসা করার জন্য।

আজাদের পিতামাতার সে বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে সম্মান করে আগুন। আগুন জানে অধঃপতিত বিধর্মীয় মানুষেরা কীভাবে অবমানবরূপে মানুষের ক্ষতি সাধন করে। নিজ স্বার্থ হাসিলের কারণে এদের অনেকে একবারও হিসাব করে না নিজে মরেছি মরেছি, যেন অন্যকোন মানুষের যৎসামান্য ক্ষতি না হয়। আগুনের বাবা একজন ব্যাংক কর্মকতা ছিলেন, আগুনের বাবার কলিগরা সকলে মিলে মরা মানুষর নামে নিজ ব্যাংক থেকে লোন তুলে আত্মসাৎ করে সে দায় চাপিয়েছিলো আগুনের বাবার ওপর। আদালতে মামলা মোকদ্দমায় আগুনের পিতা জয়ী হলেও দীর্ঘ সময় মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আগুনদের পরিবারটি একসময় প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। আগুন সে ইতিহাস ভালো করেই মনে রেখেছে। তখন থেকেই আগুনের মনে বেয়াদব ও বিধর্মীয় অবমানবরূপে মানুষের নৈতিক স্খলন দেখলে বা শুনলে শরীরে আগুন জ্বলে যায় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত গালে দু-চারটে থাপ্পর বসাতে না পারে ততক্ষণ পর্যন্ত আগুনের পেটের ভাত হজমই হয় না। আজাদ আগুনকে নালিশ করেছে তার দোকানের সুযোগসন্ধানী মালিক ব্যবসা ভালো চলছে দেখে চুক্তি অমান্য করে জামানতের নামে চাঁদাবাজি ও ঘরভাড়ার টাকা দ্বিগুন দাবি করেছে। না দিলে এক মাসের মধ্যে ঘর ছাড়ার হুমকি দিয়েছে। এতে আজাদ বিপদে পড়েছে।


এই শহরে আজাদকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার মতো কেউ নেই। আজাদকে বিপদ থেকে উদ্ধার না করলে সকলে হয়ত মনে করবে আজাদকে চেয়ারে বসতে দিয়ে পিছন থেকে চেয়ার টান দিয়েছে আগুন। এমনকি ক্ষতির হিসাব টানতে গিয়ে শেষপর্যন্ত আজাদ যদি বলেই বসে আগুনের জন্যই আজ তার এত ক্ষতি। সেদিন যদি আজাদের পরিবারের পীড়াপীড়িতে রাজি না হয়ে নিজ বুদ্ধিতে কেটে পড়তো আগুন, তেমনটি হলে কথা ছিলো না। কিন্তু দায় যখন আগুন নিয়েছে দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে তাকে। আজাদকে বিপদ থেকে উদ্ধারের দায় মনে করেই আজ চিলমারীতে যেতেই হচ্ছে আগুনকে।


আগুনের অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট এখনও প্রকাশ হয়নি। সময়টাও বেশ অনুকূলে। তাই সে প্রস্তুত হচ্ছে চিলমারী যাবার জন্য। মাথার চুল ঠিকঠাক করতে করতে মাকে ডাক দিলো ওমা কিছু টাকা চাইলাম দিলে না যে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আগুনের প্রস্তুতি দেখে আজাদ এবার সত্যি সত্যি রেগে উঠলো। আগুনকে ধমক দিয়ে বললো, মাথা ঠিক আছে তোর? আন্টি একটু আগেই তো টাকা দিয়ে গেলো, পকেটেই তো রাখলি! আর আমার ওখানে গেলে তোর টাকা লাগে নাকি? চল আর দেরি করা যাবে না।

মিলনকে একা রেখে এসেছি। দোকানের মালিক কখন কী করে বসে তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। মালিক দোকানে তালা লাগাবে বলে মিলনকে হুমকি দিয়েছে। ওর কাছে চাবি চেয়েছে। ও বলেছে আমার কাছে চাবি নেই, আজাদ ভাইয়ের কাছে চাবি চাবেন। এ নিয়ে মিলনের সাথে মালিকের তুমুল ঝগড়াঝাটি হয়েছে। আমি তিনদিন থেকে মালিকের সাথে দেখাই করি না। আমি যতসব চিন্তায় আছি, আর তুই কী যে সব করছিস তার মাথামুণ্ডু নেই। এই বলে আগুনকে এক প্রকার জোড় করে বাড়ি থেকে বের করলো আজাদ। গেট পার হতে না হতেই ফের ব্রেক করলো আগুন। আজাদকে বললো তুই একটু থাম্। মাকে একটা কথা বলে আসি।

আজাদ এবার হেসেই দিলো! বললো মাত্র ত্রিশ মাইল। বিদেশ যাচ্ছি না তো। আগুন আজাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ওকে বুঝাতে চাইলো মায়ের চোখের আড়াল হওয়া আর বিদেশ যাওয়া একই কথা। ও আচ্ছা ঠিক আছে, তুই আন্টির সাথে কথা বলে শাপলা মোড়ে চলে আয় ওখান থেকেই বাসে উঠবো বলে আজাদ শাপলা মোড়র দিকে এগিয়ে গেল।


সূর্য প্রায় মাথার উপরে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর অবশেষে ত্রিশ সিটের একটি বাস প্রায় ষাটজন যাত্রী নিয়ে শাপলা মোড়ে স্ট্যান্ড করলো। বসার কোন সিট ছিলো না। ভাগ্যিস শাপলা মোড়ে এক্সট্রা সিটের দু'জন মহিলা নেমে যাওয়ায় আজাদ সিট দু'টো দখল করে দু'জনে কোনমতে বসে পড়ে। বাসের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন যাত্রী চেষ্টা করেও সিট দু'টো দখল করতে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কখনও আজাদ কখনও আগুনের পিঠে ও মাথায় মৃদুচাপে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করছে। যাত্রীমহোদয়গণ এমনভাবে দাঁড়ালেন যেন নড়াচড়া করারও কোন সুযোগ নেই কারও। আজাদ একটু খোলামেলা বসেছে কিন্তু আগুন কোনমতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারছে না। একদিকে চাপাচাপি অন্যদিকে পাশের সীটে বসা মেয়েটির শরীরে যাত্রী মহোদয়গনের যে স্পর্শ ক্রিয়া-কৌশলের অপচেষ্টা চলছে সেটি মেয়েটি বুঝতে না পারলেও আগুন বেশ বুঝতে পারছে। আগুন এক যাত্রীকে তো ধমক দিয়েই বললো ভাই হাতটা জায়গামতো রাখুন। আগুনের ধমক শোনামাত্র মেয়েটির চেতনা ফিরলো। এলোচুলে হাত বুলাতে-বুলাতে সে বলেই উঠলো উহ! এত ভিড়! মেয়েটির সুরেলা কণ্ঠ আগুনের মনে দাগ কাটল সত্য কিন্তু তাকে চোখ তুলে মুখদর্শন করার মতো সাহস হলো না আগুনের।


আগুনের মনে ভয়। চোখে চোখ পড়লে ফের যদি লজ্জা পেতে হয়, সে যদি বলেই বসে চোখের চিকিৎসা করান। চোখ ফেরালো আগুন। অথচ কী আশ্চর্য! পা তো সরছে না! মেয়েটির ডান পা, আগুনের বাম পায়ের হাঁটুর সাথে এমনভাবে আটকা পড়েছে, পা সরাতে গেলেই মেয়েটি নির্ঘাত চটে উঠবে। হয়ত মনে মনে বলবে ইচ্ছা করেই ছেলেটি পা দিয়ে খেলছে। হয়ত গালিও দিতে পারে বেয়াদব! অথচ মেয়েটির খেয়ালেই আসছে না যে- সে কোন দরিয়ায় সাঁতার কাঁটছে। এমন স্বচ্ছ দরিয়ায় সে কতক্ষণ সাঁতার কাটতে পারবে। এমন দরিয়ায় নিজে স্বচ্ছ না হলে সাঁতার কেটে কেউ কূলে পৌছাতে পারে না। এর জন্য দূরদর্শীতার প্রয়োজন হয়। সেই-দূরদর্শীতা তার আছে কি? আগুন ভাবছে, যদি থাকে পায়ের বাঁধন খুলে যাবে, আর যদি না খোলে তাহলে মোহনায় গেলেই বুঝা যাবে সেটা নীলদরিয়া।


বাস চলছে আপন গতিতে। ইতোমধ্যে অনেক যাত্রী নেমে গেছে। প্রায় দশ কিঃ মিঃ অতিক্রম করার পর এখন যাত্রীসব স্বচ্ছন্দ্য বোধ করছে। জানালা দিয়ে সবেমাত্র বাইরের মলয়কান্তি মৃদু শীতলাতায় বাসের ভেতরে চেপে ধরা ভ্যাপসা বাবুকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। এদিকে বাসের ভেতরের চটাচটি দূর করে চ্যাটার্জী যাত্রীমহোদয়গণ ক্ষান্ত হয়েছেন। ড্রাইভার দাদা দুইগালে দু'টি পান পুড়ে বাসের গতি বৃদ্ধি করলেন। একটু স্বস্তি পেয়ে আজাদ মাথা ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো, আগুনকে প্রশ্ন করলো, কিরে হার্টবিট ঠিক আছে তো?


আগুন জবাব দেয়, ফাজলামো একটু কম কর। এমন সময় বাসের ভেতর মেয়েটির সাথে বসা এক বৃদ্ধা হঠাৎ আগুনকে দেখে প্রশ্ন করে, ওবাবা তোমরা চেংটু মাঝির ব্যাটা নোয়ান? বুড়ির কথা শুনে মেয়েটি উচ্চ কন্ঠে হাসতে চাইলো, মুখে হাত চেপে তারপর চাপাহাসি এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ খুলে হেসেই ফেললো।


বুড়ির প্রশ্নের কোন জবাব দিতে না পারায় এবং মেয়েটির হাসি দেখে আগুন যে লজ্জা পেয়েছে আজাদ বুঝতে পেয়ে বুড়িকে জানায়, না বুড়িমা আপনি অন্য কাউকে মনে করেছেন। তো আপনি কোথায় যাচ্ছেন, বুড়িমা জবাবে জানায়, 'চিলমারী'। কিছুক্ষণ পর বাসটি চিলমারীর মাটিকাটা মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। যাত্রীরা একএক করে নামতে থাকলো। আজাদ-আগুনও নেমে রিকসায় উঠলো। পিছন ফিরে তাকাতেই মেয়েটি আগুনকে লক্ষ্য করে বাইবাই দিলো। আগুনও বাইবাই জানাতে না জানাতে মেয়েটি আসি বলে হাসি দিয়ে রিকসায় উঠে চলে গেলো।


বন্দরে গান বাজছে ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে। গানের সুরে আগুনও গুনগুন করছে। এরই মধ্যে মেয়েটির হাসি ও আসি বলার বিষয়টি আগুনের মনের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়। কখন যে গানের সুর বিলীন হয়ে গেছে সেটা একবারও মনে আসেনি আগুনের। সে মনে মনে কবিতা লিখছে-


তোমার খোঁপায় ফুল দেব প্রিয় হলুদ মাখাবো তোমারই গায়, কালো কেশে তোমার বেণী করাবো, চন্দন পরাবো তোমারই পায়!


রিকসা গিয়ে দাঁড়ালো আজাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। রিকসা থেকে নেমেই আগুনের মাথা ঘুরে গেল। আজাদের দোকানের মালিক আজাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড নামিয়ে নিজের নামে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। আজাদ ও আগুনকে রিকসা থেকে নামতে দেখে দোকানের কর্মচারী মিলন এগিয়ে এসে নালিশ করে জানালো, ভাই আমি দোকানের চাবি দেইনি জন্য মালিক আমাকে অনেক গালিগালাজ করে একটু আগে নিজের নামে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। কতবড়ো সাহস সরকারি জায়গা দখল করে মানুষের কাছে জামানতের টাকা নেয়, মাস গেলে ভাড়ার টাকা নেয়, বছর না যেতেই ভাড়া বাড়ানোর কথা বলে ভাড়াটিয়ার সাথে চাঁদাবাজি শুরু করে। হুকুম দেন দোকান মালিকের চাঁদাবাজি বের করে দিয়ে আসি। আগুন মিলনকে শান্ত করে এবং মালিকের সাথে কথা বলবে সেটা মালিককে জানাতে বলে এবং মালিকের সাইনবোর্ড নামিয়ে পুনরায় আজাদের সাইনবোর্ড তুলে দিয়ে আজাদের ভাড়াবাড়ির রুমে চলে যায়।


পরদিন সকালবেলা আজাদ আগুনের আগেই ঘুম থেকে উঠে দোকান খোলে। দোকানের মালিক লোক মারফৎ সেই সংবাদ শুনে দোকানের সামনে এসে উপস্থিত। কোনমতেই আজাদকে দোকান খুলতে দেবে না। এ নিয়ে উভয়ের মাঝে কথা কাটাকাটি চলছিলো। এমন সময় আগুনও এসে উপস্থিত। আগুনকে দেখামাত্র মহাজন এগিয়ে আসে। আগুনকে নালিশ করে বলে, দেখো বাবা আগুন তোমাকে চিনি বলে তোমার বন্ধুকে দোকানঘরটি ভাড়া দিয়েছি। তোমার বন্ধুর আচরণ খুব খারাপ। কেমন খারাপ জানতে চায় আগুন। মালিক জানায়, বাবা আগুন খুব একটা সমস্যায় আছি এজন্য আরও একলক্ষ টাকা দোকানের জামানত হিসেবে চেয়েছি, আর আগামী মাস থেকে পাঁচশত টাকা করে ভাড়া বাড়াতে হবে বলেছি। বলামাত্র তোমার বন্ধু আমার দোকানঘর থেকে আমাকেই বের করে দিয়েছে। ঘরভাড়া দিয়েছি ভাড়াটিয়ার কাছে মাথা বিক্রি করে দিয়েছি নাকি। আমি আর আমার ঘর ভাড়া দেবই না।


মালিকের কথা শুনে আগুন আশ্চর্য হয়ে বলে- কী বলেন আপনি! ঘর তো তিন বছর চুক্তিতে তিন লক্ষ টাকা জামানত নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন। ভুলে গেছেন মনে হয়। চুক্তি খেলাপ করে কথাবার্তা বললে মানুষের সঙ্গে বিবাদ হবেই। আপনি মুরব্বি মানুষ, নৈতিকতা আমরা আপনার কাছেই শিখবো, কিন্তু দেখছি নিজ প্রয়োজনে আপনি ও আপনাদের মতো কিছু মানুষ নীতি-নৈতিকতা ভুলে গিয়ে অন্যায় করেই চলছেন। যা হোক এ নিয়ে আইনি কথা বলতে চাই না, ঠিক আছে আপনার টাকার সমস্যা সমাধান করে দেব। বলে আবারও রুমে চলে আসে আগুন।


আগুন একাই রুমে শুয়ে আছে। মনে কী চলছে বুঝা যাচ্ছে না। মাস্টারের হোটেলে গিয়ে সকালের নাস্তা দুপুরের খাবার খায়নি এখনও। সে খবর নিয়েছে আজাদ। আগুনের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে তোর? লক্ষ্য করছি তুই কি যেন ভাবছিস। আগুন জানায়, কই, তেমন কিছু না। তেমন কিছু না মানে? বললেই হলো? তুই কি মালিকের কথার কোন মানে খুঁজে পেলি? কী করবি এখন, ওনাকে কি আবারও টাকা দিবি, নাকি আইনের আশ্রয় নেব আমরা? আরে না। অমন বেয়াদব লোকদের সাথে বিবাদ করলে নিজেদেরই ক্ষতি। টাকা আছে দিয়ে দেব। আমি ওসব ভাবছি না। ভাবছি অন্য কথা। এক বছর এখানে ব্যবসা করছিস বাসের মেয়েটিকে চিনিস। চিলমারীতেই তো নামলো।

আজাদ জানায় হ্যাঁ চিনি। মেয়েটির নাম বীণা। ওর বাড়ি বন্দরের পশ্চিম দিকে জোরগাছ গ্রামে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। আমার দোকানে দু'-একবার এসেছিলো। শুনেছি ভালো পরিবারের মেয়ে ও। পছন্দ হলে বল্ মাস্টারের সাথে কথা বলি। শুনেছি বীণাদের বাড়ি মাস্টার ও মিলনের বাড়ির কাছাকাছি। ওরা মেয়েটিকে ভালো চেনে ও জানে।


আগুন এবার আড়মোড়া দিয়ে বিছানা থেকে উঠে গোসল সেরে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য মাস্টারের হোটেলে যায়। হোটেলের মালিক রাজু মিয়া। তাকে সবাই কেন মাস্টার বলেই ডাকে জানে না আগুন। বন্ধুসুলভ আচরণ মাস্টারের। আগুনকে দেখামাত্র মাস্টার চেয়ার থেকে নেমে জড়িয়ে ধরে। বলে, কী ব্যাপার আগুন ভাই ওই যে আজাদ ভাইকে রেখে গেলেন, আর এলেনই না। মিলন একটু আগে এসে জানিয়ে গেল আপনি এসেছেন। আর কিছুক্ষণ পর আমিই যেতাম আপনার সাথে দেখা করতে। এসেছেন ভালো হয়েছে। দুপুরের খাবার তো এখনও খাননি, খেয়ে নেন বলে মেসিয়ারকে খাবার দিতে বলে।


আগুন খাবার খেতে খেতে মাস্টারের কাছে জানতে চায় মাস্টারসাব আপনার গ্রামের বীণা নামের মেয়েটিকে তো চেনেন জানেন, বলেন তো মেয়েটি কেমন? আগুনের কথা শুনে মাস্টার মুচকি হাসে। জিজ্ঞেস করে পছন্দ হয়েছে নাকি।


মিলনের বাড়ির অল্প কিছুদূরে বীণাদের বাড়ি। একসময় বীণাদের বাড়িতে মিলনের যাতায়াত ছিলো।

পছন্দ হলে বলেন মিলনকে পাঠিয়ে বীণার ভাইয়ের সাথে কথা বলি। ওর ভাইকে খবর দিলে আমার দোকানেই চলে আসবে।


হ্যাঁ! তাই করেন মাস্টারসাব। বীণাকে আমার পছন্দ হয়েছে, সে রাজি থাকলে মাকে খবর দিবো শুভকাজ সেরে একেবারে বাড়িতে চলে যাব। তার আগে আমি বীণার সাথে সরাসরি কথা বলতে চাই, দেখেন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। আগুনের কথা শুনে মাস্টার মিলনকে মোবাইলে দোকানে ডাকে। মিলন অল্পক্ষণে চলে আসে মাস্টারের দোকানে। মাস্টারের কাছে সবকিছু শুনে মিলন আর এক মুহূর্ত দেরি করতে রাজি নয়। এখনই যাবে বীণাদের বাড়ি। আগুন আটকায়। মিলনকে বলে একটু অপেক্ষা করেন মিলন সাহেব। আমি বীণাকে একটা চিঠি লিখবো। চিঠিটি বীণার হাতেই দিয়ে আসতে হবে। মিলন বলে ঠিক আছে ভাই লেখেন।


সারারাত জেগে আগুন চিঠি লিখছে। সে চিঠির ভাষা মেলে না। ডাস্টবিন ভরে গেল। চিঠি লেখা শেষ হচ্ছে না। শেষে কী আর করার আছে। সব কেটেকুটে মাত্র কয়েক লাইন লিখলো, বীণা আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। আপনার হাসিতে আমি আহত। মা মেয়ে খুঁজছেন।

যদি রাজি থাকেন বিয়ে করতে চাই।

আপনার পরিচিত মিলনের কাছে আমার সমন্ধে জেনে নিবেন। দেখা

করতে চাইলে আশা করি যোগাযোগ করবেন। মিলন সেই চিঠি বীণাকে পৌছে দিলো। চিঠি পেয়ে বীণা হাসলো। মিলনকে বললো যাব মিলন ভাই আপনার বন্ধুর সাথে দেখা করতে। মিলন জবাবে বললো, না বীণা আপা আমার বন্ধু নয়, আমার মালিকের বন্ধু। মিলন আগুনের সম্পর্কে বীণাকে সবকিছু খুলে বলে ফিরে আসলো। একদিন গেল। দু'দিন গেল। চিঠির কোন জবাব পাচ্ছে না আগুন। সবকিছুই কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগছে, কোন কাজেই মন বসছে না তার। আগুনের এমন অস্থিরতা দেখে আজাদ প্রশ্ন করে শেষপর্যন্ত এখানেই এসে মরতে চাস। তার চেয়ে আন্টি যেসব মেয়ে দেখেছে সেখান থেকেই একটা চয়েস কর, সেটাই মঙ্গল হবে।


আরে বাবা এখনই আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসলাম না তো, আগে দেখি বীণা চিঠির জবাব দেয় কী না। আসে কী না! রাজি হয় কি না বলে আগুন চা খেতে মাস্টারের হোটেলে যায়।


একসপ্তাহ পার হয়ে গেল, বীণা চিঠির কোন জবাব দিচ্ছে না, আসছেও না। হয়ত আর আসবেও না মনে করে আগুন নিজেকে খুব ছোট মনে করতে লাগলো। মনে মনে ভাবছে, ছিঃ এত বড় ভুল করলাম! ফুলশয্যা রাতে স্ত্রীর কাছে কীভাবে মিথ্যে বলবো জীবনে কোন মেয়েকে একটিও চিঠি লিখিনি।


আগুন আজ বড় অনুতপ্ত, বড় লজ্জিত নিজের কাছে। কোনমতেই হিসাবে মিলাতে পারছে না। সেদিন বাসের মধ্যে কেন বীণা পায়ের বাঁধন খুলেছিলো। সে কি মনে করেছে এক পলকে একটু দেখায়, যে পুরুষের নেশা লাগে তার ভালোবাসা তো দূরের কথা ভালোলাগাটাও সন্দিহান। আগুন আর ঠিক ভাবতে পারছে না।


এমন সময় আজাদ এসে জানালো বীণা মিলন মারফৎ খবর পাঠিয়েছে আগামীকাল কয়েকজন বান্ধবীসহ এখানে বেড়াতে আসবে। আজাদের কথা শুনে আগুন বিশ্বাসই করতে পারছে না আজাদ সত্য বলছে।

কিছুক্ষণ পর মাস্টারও এসে জানালো, আগুন ভাই বীণার বড়ভাই আগামীকাল সন্ধ্যার পর আমার দোকানে আসবে, বীণাকে লেখা আপনার চিঠি ওদের বড়ির সকলে পড়েছে। ইতোমধ্যে আপনার চৌদ্দগুষ্টির খোঁজখবর নিয়েছে তারা। কাজটা মনে হয় হয়েই যাবে এমন ইংগিত পেয়েছি। হলে ভাই আমরাও খুশি। দারুণ মানাবে আপনাদের দু'জনকে।


মাস্টারের কথা শুনে আগুন এবার থমকে গেল, ভাবতেই পারছে না এখন কী করা দরকার। চিলমারীতে অভিভাবক বলতে তো কেউই নেই। মাকে খবরটা দিবে কি না ভাবছে। এদিকে আগামীকাল যদি বীণা তার বান্ধবীদের নিয়ে সত্যি সত্যি চলে আসে কীভাবে সামলাবে সে। আজাদকে ডাক দিলো আগুন, বললো-কাল ওরা আসবে আমি বেশি কথা বলতে পারবো না। তুই সব সামলাবি। আজাদ বলে ঠিক আছে কাল আগে আসতে দে।


পরেরদিন দুপুরে বীণা তার বান্ধবীদের নিয়ে আসি বলেই রুমে প্রবেশ করে। বীণার বান্ধবী সোনালী কোথায় বসবে ঠিক স্থির করতে পারছে না দেখে আজাদ বলেই ফেললো, ভাড়াবাড়ি তাই তেমন কিছু নেই এখানে। তাছাড়া আমরা এখানে কয়েকদিনের অতিথি মাত্র, মনে কিছু না করে আপনি টেবিলের ওপর বসে পড়ুন। বলেই চুপ রইল।


আগুন বুঝতে পারে, আজাদের আর বিশেষ কোনকিছু বলার নেই। এই ফাঁকে আগুন বীণাকে এক পলক দেখে নিলো। মনে মনে ভাবলো ঠিকই আছে, চলবে। বীণাও তাকালো আগুনের দিকে। বীণাকে দেখে মনে হলো সে কী যেন ভাবছে।


আগুন প্রশ্ন করে- চিঠি লিখেছি, মাইন্ড করেননি তো? বীণা হাসে। বললো- না মাইন্ড করার কী আছে?

তারপর চুপ। আগুন আবারও প্রশ্ন করে- কিছু বলছেন না যে। কী যে বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না! মৃদু হাসিতে জবাব দিলো বীণা। তারপর আগুনের দিকে চেয়ে মাথা নীচু করলো। ওদিকে বীণার বান্ধবী সোনালী ও অন্যরা দলপাকিয়ে আজাদের সাথে কী যেন শলাপরামর্শ করছে আগুন সেটা বুঝতে পারছে না। এরই মধ্যে বীণা আগুনের খুব কাছাকাছি হয়, কানের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলে, আপনি দেখতে সত্যিই সুন্দর আগুন ভাই, মুগ্ধ হওয়ার মতো। সাহসী মানুষও বটে। ভালো লেগেছে আপনাকে। কিন্তু অনেকটা দেরিতে আপনার সাথে পরিচয় হলো। আমার কিছু কথা আছে আজাদ ভাইকে বলে যাচ্ছি শুনে নেবেন, বলে আজাদসহ বীণা আড়াল হলো।


আজাদ ও বীণার দু'জনের মাঝে সেদিন কি সব কথা হয়েছে, আগুন শেষপর্যন্ত তার কোন মানে বুঝে উঠতে পারেনি। তবে আগুন এতটুকু বুঝেছে বীণা তাকে হেয় করেনি, অপমান করেনি, তার মধ্যে ভদ্রতা ও সৌন্দর্য ছিলো। তবে যে কারণেই হোক বীণা হয়ত বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়নি।


বাবা বেঁচে নেই। মায়ের দেখা মেয়ের সাথে আগুনের আজ বিয়ে। ধুমধাম করে বিয়ে হচ্ছে। বিয়ের আগে নববধুকে একটিবারও দেখেনি আগুন। দেখার ইচ্ছেও জাগেনি। না দেখেই বিয়েতে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলো সে। ঘোমটা তুলে নববধুর মুখ দেখার পূর্বে বীণার কথা মনে পড়ে তার। বীণার হাসি এবং আসি বলার ঘটনা স্মরণ করে বারবার। ঘোমটা খুলে নববধুর মুখ দেখতে সাহস হচ্ছে না আগুনের। একবার ঘোমটা খুলতে যায় তো আর একবার পিছায়, আর একবার ঘোমটা খুলতে গেলে নববধূর অট্টহাসিতে তোলপাড় হয় বাসরঘর। আগুন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নববধূর মুখপানে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. কবির তুমি ওনের ডেবলপ করছ ৷ তোমার গল্প ফাডাফাডি হইছে , তুমি এগিয়ে যা

    উত্তরমুছুন

অমার্জিত মন্তব্য করে কোনো মন্তব্যকারী আইনী জটিলতায় পড়লে তার দায় সম্পাদকের না৷